ইউরোপ বহু বছর ধরে যুদ্ধ, নিপীড়ন, দারিদ্র্য, জলবায়ু দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে পালিয়ে আসা মানুষের কাছে নিরাপত্তার এক বড় আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ইউরোপই ধীরে ধীরে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আরও কঠোর হয়ে উঠছে। মানবিক দায়িত্ব, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক চাপ এবং জনমতের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে ইউরোপীয় অভিবাসননীতি এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গত সোমবার প্রকাশিত হয়েছে ‘গ্লোবাল রিফিউজি ক্রাইসিস ২০২৬’ নামে একটি প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনকে অনেক গবেষক শুধু তথ্যভিত্তিক নথি হিসেবে দেখছেন না; বরং তারা একে আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করছেন। প্রতিবেদনের সহ-সম্পাদক পেত্রা বেন্ডেল মনে করেন, ইউরোপ এখন যে পথে হাঁটছে, তা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
জার্মানির বাভারিয়ার এরলাঙ্গেন-নুরেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পেত্রা বেন্ডেল প্রতিবেদনটি উপস্থাপনের সময় ইউরোপীয় আশ্রয়ব্যবস্থার নতুন আইনি কাঠামো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই কাঠামোটি ২০২৪ সালে গ্রহণ করা হয়েছিল। আগামী ১২ জুন থেকে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্রে বাধ্যতামূলক আইন হিসেবে কার্যকর হবে।
এই নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে আশ্রয় আবেদন দ্রুত যাচাই করা, সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং যাদের আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তাদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা। কাগজে-কলমে এটি প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ মনে হতে পারে। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসন গবেষকদের বড় অংশের আশঙ্কা, এর ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের মানবিক অধিকার আরও সংকুচিত হতে পারে।
পেত্রা বেন্ডেলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ইউরোপের বহি-সীমান্ত ঘিরে। তিনি আশঙ্কা করছেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এমন আবাসনের পরিসর বাড়তে পারে, যা কার্যত বন্দিশিবিরের মতো হয়ে উঠবে। অর্থাৎ মানুষ ইউরোপে পৌঁছালেও তাদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা, আইনগত সহায়তা পাওয়া কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
এখানে প্রশ্ন উঠছে, ইউরোপ কি আশ্রয় দেওয়ার নীতি থেকে ধীরে ধীরে আশ্রয়প্রার্থীদের দূরে রাখার নীতিতে সরে যাচ্ছে? অভিবাসন বিষয়ক গবেষকরা বলছেন, কোনো মানুষ কেন আশ্রয় চাইছে, তার পেছনের মানবিক কারণগুলো বুঝতে হবে। কিন্তু ইউরোপের অনেক রাজনীতিবিদের কাছে এখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, ভোটারদের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
আরেকটি বিতর্কিত পরিকল্পনা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের তৃতীয় কোনো দেশে প্রত্যাবাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা। যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হবে, তাদের ইউরোপে না রেখে এসব কেন্দ্রে পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছে। পেত্রা বেন্ডেল এই পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এমন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা আরও দুর্বল হতে পারে।
অন্যদিকে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন দলের নেতা আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট এই ধরনের উদ্যোগকে ‘উদ্ভাবনী’ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছেন, অভিবাসন চাপ সামলাতে প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে নতুন ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন হলো, এই নতুন ব্যবস্থা কি সত্যিই সমস্যার সমাধান করবে, নাকি আশ্রয়প্রার্থীদের আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে?
প্রত্যাবাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এমন কিছু দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে, যারা এই দায়িত্ব নিতে রাজি হবে। সম্ভাব্য দেশের তালিকায় তিউনিসিয়া ও মিশরের নাম আলোচনায় আছে। কারণ এসব দেশের সঙ্গে ইউরোপের মধ্যে ভূমধ্যসাগর ছাড়া বড় ভৌগোলিক দূরত্ব নেই। আবার রুয়ান্ডা ও উগান্ডার মতো তুলনামূলক দূরের দেশেও এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের চিন্তা করা হচ্ছে।
কিন্তু এখানেও অনেক প্রশ্ন আছে। কোনো আশ্রয়প্রার্থী যদি ইউরোপে সুরক্ষা চাইতে আসে, তাকে তৃতীয় দেশে পাঠানো কতটা ন্যায্য? সেই দেশে তার নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আইনগত সহায়তা, মানবিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ কি নিশ্চিত করা যাবে? শুধু সীমান্তের চাপ কমানোর জন্য মানুষকে অন্য দেশে সরিয়ে দেওয়া কি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল হয়ে দাঁড়াবে না?
পেত্রা বেন্ডেল মনে করেন, ভবিষ্যতে ইউরোপে সুরক্ষা চাইতে আসা মানুষদের অবস্থা আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা আছে। নারী, শিশু, নির্যাতনের শিকার মানুষ, রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের মানুষ—তাদের জন্য আশ্রয় প্রক্রিয়া যদি আরও কঠোর হয়, তাহলে মানবিক বিপর্যয় আরও বাড়তে পারে।
আফগানিস্তান থেকে আসা মানুষদের পুনর্বাসন কর্মসূচি এই সংকট বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। জার্মান সরকার আফগানদের পুনর্বাসন কর্মসূচি স্থগিত করার পর অনেক মানুষ নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন। তালেবান শাসনের অধীনে যারা নির্যাতন, হুমকি বা প্রতিশোধের ঝুঁকিতে আছেন, তাদের অনেকেই এখনো পাকিস্তানে আটকা পড়ে আছেন। তারা ইউরোপে নিরাপত্তা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও বাস্তবতা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
পেত্রা বেন্ডেলের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়ে শেষ হয় না। যারা বাস্তব বিপদের মুখে আছে, তাদের জন্য কার্যকর পথ, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং সম্মানজনক আশ্রয় নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব। তার ভাষায়, জার্মানির উচিত সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।
জার্মানির ওসনাব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন বিষয়ক গবেষক ফ্রাঙ্ক ড্যুফেলও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এই পরিকল্পনাকে ত্রুটিপূর্ণভাবে প্রণীত বলে মনে করেন। তার মতে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এই সংস্কারের ফলে বিভিন্ন পর্যায়ে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। এতে অভিবাসনপ্রত্যাশী শিশু, নারী এবং পরিবারগুলোর অধিকার সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
সংখ্যার দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানিতে আসা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। ২০২৩ সালে জার্মানিতে তিন লাখ ৩০ হাজার মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। দুই বছর পর সেই সংখ্যা কমে এক লাখ ১৩ হাজারে নেমে আসে। অর্থাৎ বাস্তব পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় কমছে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত, প্রায় ২২ হাজার রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই হার যদি সারা বছর একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে বছর শেষে মোট আবেদনের সংখ্যা ৯০ হাজারেরও কম হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যখন আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা কমছে, তখন আরও কঠোর নীতি নেওয়ার প্রয়োজন কতটা?
এখানেই ইউরোপীয় রাজনীতির বাস্তবতা সামনে আসে। অনেক দেশে অভিবাসন এখন নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠেছে। ডানপন্থী ও রক্ষণশীল দলগুলো অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান দেখিয়ে জনসমর্থন বাড়াতে চাইছে। ফলে মানবিক প্রশ্ন অনেক সময় রাজনৈতিক স্লোগানের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সীমান্তের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও বাস্তব মানুষ—তাদের ভয়, ক্ষতি, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার প্রয়োজন আছে।
২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বর্তমানে ১১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। গত এক দশকে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। এর অর্থ হলো, শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুতি সংকট কোনো সাময়িক সমস্যা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক ভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, বন্যা ও খাদ্য সংকট—সব মিলিয়ে মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকাংশই ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছান না। তাদের বড় অংশ নিজ দেশের ভেতরেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পালিয়ে থাকেন। এদের বলা হয় অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি। তারা যুদ্ধ, সহিংসতা, খরা, বন্যা বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচতে ঘর ছাড়লেও আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করতে পারেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন মানুষের খুব সামান্য অংশই শেষ পর্যন্ত ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছাতে পারে।
এই বাস্তবতা ইউরোপের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। যদি বিশ্বের বাস্তুচ্যুত মানুষের সামান্য অংশই ইউরোপে পৌঁছায়, তাহলে তাদের প্রতিও কি আরও কঠোর সীমান্তনীতি প্রয়োগ করা উচিত, নাকি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগির পথে এগোনো উচিত? শুধু সীমান্তের বাইরে কেন্দ্র তৈরি করে সমস্যাকে দূরে ঠেলে দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে সংকটের মূল কারণ দূর হয় না।
ইউরোপের সামনে তাই দুটি পথ। একদিকে আছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত প্রত্যাবাসন, সীমান্তে আটকাবস্থা এবং তৃতীয় দেশে পাঠানোর নীতি। অন্যদিকে আছে মানবিক আশ্রয়, ন্যায্য আবেদন প্রক্রিয়া, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ। বাস্তবে হয়তো ইউরোপ এই দুই পথের মাঝামাঝি কোনো ভারসাম্য খুঁজতে চাইবে। কিন্তু সেই ভারসাম্য যদি মানবিক মর্যাদাকে উপেক্ষা করে তৈরি হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।
অভিবাসন শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি মানবতারও প্রশ্ন। কেউ আনন্দে নিজের দেশ, ঘর, পরিবার, ভাষা ও শিকড় ছেড়ে অনিশ্চিত পথে পা বাড়ায় না। অধিকাংশ মানুষ বাধ্য হয়। তাই নীতি প্রণয়নের সময় শুধু সংখ্যা, সীমান্ত ও প্রশাসনিক কাঠামো দেখলেই হবে না; দেখতে হবে মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার দিকটিও।
ইউরোপের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে কি না, সেটি এখনই চূড়ান্তভাবে বলা কঠিন। তবে দরজাটি আগের চেয়ে অনেক সংকীর্ণ হচ্ছে—এ কথা স্পষ্ট। নতুন আশ্রয়নীতি কার্যকর হওয়ার পর বোঝা যাবে, ইউরোপ মানবিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করে। কিন্তু গবেষকদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হতে পারে সবচেয়ে দুর্বল মানুষদেরই।

