ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন। বুধবার (৩ জুন) সকালে মালবীয় নগরের হাউজ রানি এলাকায় অবস্থিত পাঁচতলা একটি আবাসিক হোটেলে আগুনের সূত্রপাত হয়।
আগুন দ্রুত ভবনের বিভিন্ন তলায় ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন হোটেলে অবস্থানরত অতিথিরা। দমকল বাহিনী, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করেন। তবে এরই মধ্যে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ জনে।
নিহতদের বেশিরভাগই বিদেশি নাগরিক
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে ১৮ জনই বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, লাইবেরিয়া এবং আফগানিস্তানের নাগরিক রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোন দেশের কতজন নাগরিক নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আহতদের অনেকেই ধোঁয়াজনিত শ্বাসকষ্ট ও দগ্ধ হওয়ার কারণে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চিকিৎসাধীন পাঁচ বাংলাদেশি
বাংলাদেশ হাই কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আহত পাঁচ বাংলাদেশি নাগরিককে দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন ম্যাক্স হাসপাতালে এবং বাকিদের সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো আহত বাংলাদেশিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নিহতদের তালিকায় কোনো বাংলাদেশি রয়েছেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন অনেক বিদেশি
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত ও আহত বিদেশিদের একটি বড় অংশ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। ভারতের রাজধানী দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের রোগীদের চিকিৎসার অন্যতম গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। ফলে ওই হোটেলেও বিদেশি অতিথির সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।
আগুনের কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা
অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। প্রথম দিকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আশঙ্কা করা হলেও পরে তদন্তকারীরা বিদ্যুতের শর্ট সার্কিটকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন।
শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, পাশের একটি রেস্তোরাঁ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, আগুনের উৎপত্তি হোটেল ভবনের ভেতরেই। এখন বিশেষজ্ঞ দল বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস লাইন এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখছে।
তদন্তে বেরিয়ে এলো অনিয়ম
ঘটনার পর তদন্তে আরও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে, হোটেলটির অনুমোদন ছিল মাত্র ছয়টি কক্ষ পরিচালনার জন্য। অথচ বাস্তবে সেখানে প্রায় ২৫টি কক্ষ চালু ছিল।
এই তথ্য প্রকাশের পর ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি নির্গমন পথ এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে আহত পুলিশ সদস্যরাও
আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজে অংশ নিতে গিয়ে প্রায় ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ভবনে প্রবেশ করে আটকে পড়াদের বের করে আনার সময় তারা আহত হন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও আলোচনায়
এই দুর্ঘটনা ভারতের আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অতীতেও বিভিন্ন শহরে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত কক্ষ পরিচালনা, অপর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতি বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লির এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা তদারকির দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।
দিল্লির এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করলে একটি ছোট ত্রুটিও মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

