একবার ভাবুন, আপনি এমন এক ডিনারের অনুষ্ঠানে গেছেন, যেখানে আয়োজকেরা নিজেরাই ব্যাপক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন।
উত্তর আমেরিকায় প্রথমবারের মতো যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ফুটবলভক্তরা এমন তিন আয়োজক দেশের মুখোমুখি হবেন, যারা সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গেছে।
এই টুর্নামেন্ট ১৬টি শহর ও তিনটি রাষ্ট্রজুড়ে বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এটি হচ্ছে এমন এক সময়, যখন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে সম্পর্ক বেশ টানাপোড়েনপূর্ণ।
গত ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে ড্র অনুষ্ঠানে এসব দেশের নেতারা যখন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে সেলফি তুলছিলেন, তখন অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো দূরের মনে হয়েছিল।
তবে ৩৯ দিন জুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি সম্ভবত ভিন্ন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোলাখুলিই বলেছেন, তার দেশই এ অঞ্চলের প্রধান শক্তি।
এর অর্থ হলো – বাণিজ্য, অভিবাসন ও মাদকপাচারসহ নানা বিষয়ে তিন দেশের মধ্যে থাকা বাস্তব সমস্যাসমূহ, যা ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিদ্যমান, তা আবারও সামনে আসতে পারে।
আবার, সবকিছু ঠিকঠাক সম্পন্ন হলে বিশ্বকাপ এ তিন দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও গড়ে তুলতে পারে।
বাণিজ্য, পর্যটন…আর ট্রাম্পকে ঘিরে উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার মেক্সিকো ও কানাডা নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি যে ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রথম লক্ষ্যবস্তু তারাই ছিল।
কানাডা, যে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার করা মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছিল, তারা নিজস্ব ব্যবস্থা নিয়ে এর জবাব দিয়েছিল।
প্রদেশগুলো তাদের দোকান থেকে মার্কিন অ্যালকোহল পানীয় সরিয়ে ফেলে এবং কানাডিয়ানরা উল্লেখযোগ্যভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ কমিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করে।
কানাডা ও মেক্সিকো উভয়েরই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে সমস্যা রয়েছে, তা এই দুই দেশের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নীতি পরিচালক কার্লো ডেড।
অনেকে কানাডার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আগে তারা মেক্সিকোকে ‘বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে’। কারণ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছিলেন, মেক্সিকো উত্তর আমেরিকায় চীনা বিনিয়োগের “পেছনের দরজা” হিসেবে কাজ করছে।
“এটা সত্যিই অসম্মানজনক ছিল,” বলেন ডেড।
এর মানে হলো, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে এখন একই সাথে মেক্সিকোর সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে, আবার অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজের দেশের বাণিজ্য বহুমুখীকরণেরও চেষ্টা করতে হচ্ছে।
তিনে মিলে জটলা
এর আগে কখনো বিশ্বকাপ ফুটবল একসাথে তিনটি দেশে অনুষ্ঠিত হয়নি। যেহেতু ২০২৬ সালের এই টুর্নামেন্টটি পুরো একটি মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত, তাই এখানে একাধিক দেশের বহুবিধ কর্তৃপক্ষকে যুক্ত হতে হয়েছে।
ম্যাচ দেখার জন্য ভক্তরা যখন তিন দেশের মধ্যে যাতায়াত করবেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা লজিস্টিক জটিলতা তৈরি করতে পারে এবং আগে থেকেই উত্তপ্ত হয়ে থাকা পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
একই সাথে, ইরানের সাথে চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জোরদার করা নিরাপত্তা উদ্বেগ নতুন উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে এবং আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কোনো ঘটনাকেও আকস্মিকভাবে বড় সংকটে রূপ দিতে পারে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল স্পোর্টের ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এবং লেখক লিন্ডসে সারাহ ক্র্যাসনফ বলেন, “এ ধরনের বৈশ্বিক ক্রীড়া ইভেন্ট যৌথভাবে আয়োজন করা মানেই যে আয়োজকদের মধ্যে একটি আদর্শ বা মধুর সম্পর্ক তৈরি হবে, তা নয়।”
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের নারী বিশ্বকাপ, যা নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে আয়োজন করেছিল, সেটি ইতিবাচক ভাব নিয়ে শেষ হলেও সব অভিজ্ঞতা একই রকম নাও হতে পারে।
২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার যৌথ পুরুষ বিশ্বকাপটি ছিল দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসের অধিকারী এই দুই দেশের জন্য একটি “অম্ল-মধুর” অভিজ্ঞতা।
তিনি আরও বলেন, “এটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি, তবে ঐতিহাসিকভাবে একে এক ধরনের ড্র বা সমতা হিসেবেই দেখা হয়।”
তবে ফিফা নিজেই এবারের মডেলটি নিয়ে অনেক বড় আশা প্রকাশ করে বলেছে: “এটি এমন এক মুহূর্ত যখন তিনটি দেশ এবং পুরো একটি মহাদেশ একযোগে বলবে: ”ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, সেরা ও সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপ এটি”।
সমস্যা আড়ালের চেষ্টা?
প্রত্যেক দেশের নেতাই হয়তো এ টুর্নামেন্টকে ব্যবহার করতে চাইবেন, আর তা নিশ্চয়ই কেবল প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার প্রমাণ হিসেবেই ব্যবহার করার জন্য নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যারা তাদের সমালোচনা করেন, তাদের একটি শিক্ষা দিতেও ব্যবহার করতে পারেন।
মেক্সিকোর ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্য, যেখানে সহ-আয়োজন ঘিরে কিছুটা হতাশাবাদ রয়েছে।
দেশটির রাজধানীতে প্রধান বিমানবন্দরের প্রস্তুতি, যানজটপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং সংস্কারাধীন অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পাশাপাশি, কয়েক মাস আগে স্বল্পসময় হলেও ব্যাপক সহিংসতায় কার্টেল সদস্যদের রাস্তায় উপস্থিতিও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এর মধ্যেই দেশের প্রধান শিক্ষক ইউনিয়ন পেনশন ও কর্মপরিস্থিতির দাবিতে জাতীয় পর্যায়ে ধর্মঘট করছে। দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে, যা ম্যাচ দেখতে মাঠে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলো অবরুদ্ধ করতে পারে।
তাদের স্লোগান: “(আমাদের দাবি পূরণ না হলে) সমাধান না হলে , খেলা শুরু হবে না”।
তবে সমস্ত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবম দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।
গত বছর তিনি বলেছিলেন, “এটি বিশ্বের সেরা ফুটবল প্রত্যক্ষ করার এবং আমরা কারা তা সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার সময়: আমরা কেবল এক বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশই নই, বরং একটি ক্ষমতাবান জাতি।”
মেক্সিকান ক্রীড়া সাংবাদিক রাফায়েল পুয়েন্তে মনে করেন, বিশ্বকাপের আগে মেক্সিকো যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে, তা লুকিয়ে রাখা বা আড়াল করার চেষ্টা করা ভুল হবে।
তিনি বলেন, “আমি সত্যিই আশা করি ভক্তরা এই সমস্যাগুলোর মুখে ধৈর্য এবং ভালো আচরণ দেখাবেন, যা আমরা লুকিয়ে রাখতে পারি না।
আমরা কেবল সেই উত্তেজনা, উদ্দীপনা এবং প্রত্যাশার আশা করতে পারি যা মেক্সিকোর জনগণ অতীতে দেখিয়েছে, বিশেষ করে জাতীয় দলের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে।”
টুর্নামেন্টের বাইরে আরো যা লক্ষ্য
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রতিবেশী তিন দেশ যদি আগামী এক মাস পরিস্থিতি সঠিকভাবে সামাল দিতে পারে, তবে তারা অন্যান্য ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।
এই ত্রয়ী বর্তমানে একটি ঐতিহাসিক উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার এক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এ পর্যালোচনা ১৯৯৪ সাল থেকে চলে আসা একটি বাণিজ্যিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মেক্সিকো ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে, যা কানাডা এখনও করেনি।
কানাডা যেখানে চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে চাচ্ছে, সেখানে মেক্সিকো দেশটির ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বেইজিংয়ের গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে কানাডা ও মেক্সিকো ভিন্ন পথ অবলম্বন করছে বলে উল্লেখ করছেন ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগারির ডেড।
যাই হোক না কেন, বিশ্বকাপ এই তিন দেশের জন্য কূটনীতির এক বড় সুযোগ এনে দিয়েছে, যেমনটি গত ডিসেম্বরে টুর্নামেন্টের ড্র-এর সময় ট্রাম্প, কার্নি এবং শেইনবমকে হাসিমুখে একসাথে দেখার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
ডেড বলেন, “নেতারা যখনই একসাথে হন, সেটি সাধারণত ইতিবাচক কিছুই বয়ে আনে।”
তার নিজের পক্ষ থেকে ট্রাম্প, যিনি নিয়মিত বড়াই করে বলেন যে তার দেশ বিশ্বের সবচেয়ে “হটেস্ট” দেশ, স্পষ্টতই বিশ্বকাপকে বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের উজ্জ্বল হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
ইভেন্টে উপস্থিত থেকে বা ট্রুথ সোশ্যালে পোস্টের মাধ্যমে প্রচারের আলো নিজের ওপর টেনে নেওয়ার জন্য ট্রাম্পের ব্যাকুলতা যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
অন্যদিক থেকে বিচার করলে, এ টুর্নামেন্টের সাফল্যের পেছনে তার বড় ব্যক্তিগত স্বার্থও রয়েছে।
তাই তিনি হয়তো এমন কোনো কূটনৈতিক ঘটনা এড়াতে বিশেষ চেষ্টা করবেন, যা এই ইভেন্টকে কলঙ্কিত করতে পারে।
প্রবাদ আছে, ফুটবল একটি খামখেয়ালী খেলা।
আর খেলাধুলা যেমন নিজেই অপ্রত্যাশিত, তেমনি এই ত্রিপক্ষীয় আয়োজনের নতুন পরীক্ষাটি শেষ বিচারে ঠিক কোন দিকে মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব।
ক্র্যাসনফ বলেন, “একেবারে শুরু থেকেই, এমনকি যখন এই যৌথ প্রার্থিতাটি প্রথম অনুমোদন পায়, তখন থেকেই স্পষ্ট ছিল যে এটি অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন হতে যাচ্ছে।”
সূত্র: বিবিসি

