মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চলতে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহে ইরানের উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শনিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালির কৌশলগত অঞ্চলে অবস্থিত ইরানের গোরুক ও কেশম দ্বীপের নজরদারি ও রাডার স্থাপনাকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী দাবি করে, হরমুজ প্রণালির দিকে পাঠানো ইরানের চারটি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ড্রোনগুলো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চলাচলের ওপর নজরদারি কিংবা সম্ভাব্য হুমকি তৈরির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই রাডার স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে আলোচনার টেবিলের পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রেও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ চলতে থাকায় স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
ইরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে তাদের তেল রপ্তানি বাবদ আটকে থাকা বিপুল অর্থ ফেরত পাওয়া, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বন্দরসংক্রান্ত অবরোধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করার লক্ষ্যেই চাপ অব্যাহত রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ইতোমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে। তার মতে, ইরানের হাতে এখনও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থাকলেও আগের তুলনায় তাদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের নেতৃত্ব বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে এবং তাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যা আগে কখনও কল্পনাও করেনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির বাস্তবতা ইরানকে নতুন সমঝোতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তীতে এপ্রিলের শুরুতে সাময়িক বিরতি এলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও উভয় পক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে পুরো অঞ্চল আরও বড় ধরনের সংঘাতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলের জন্য গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।

