কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত। আফগান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশু, নারী ও বৃদ্ধ রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে, যা নতুন করে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
আফগান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার রাতে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলা চালানো হয়। কাবুলের অভিযোগ, পাকিস্তানি বাহিনী আফগানিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে কুনার, খোস্ত ও পাকতিকা প্রদেশের বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে আঘাত হানে।
আফগান সরকারের মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, হামলায় ১১ জন শিশু, একজন নারী এবং একজন বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। তিনি এই ঘটনাকে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।
খোস্ত প্রদেশের স্পেরা জেলায় সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। সেখানে একটি আবাসিক বাড়িতে হামলা চালানো হলে অন্তত ৯ জন নিহত এবং আরও ১০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে পাকতিকা প্রদেশের বারমাল জেলাতেও পৃথক হামলার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ঘর লক্ষ্য করে চালানো হামলায় তিন শিশু নিহত হয়। এসব ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে শুরু করেছে।
তবে এ ঘটনার বিষয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। অতীতের মতো এবারও ইসলামাবাদের অবস্থান হতে পারে যে, সীমান্তপারের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করেই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় তারা এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা তাদের নীতি নয়।
এই নতুন হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের সীমান্তে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। ফলে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, উত্তেজনা কিছুটা কমে এসেছে। কিন্তু সর্বশেষ এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে সীমান্ত পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক।
মূলত ২০২১ সালে তালেবান দ্বিতীয়বারের মতো আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ইসলামাবাদ ও কাবুলের সম্পর্ক ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করেছে, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তালেবান সরকারের ওপর চাপ দিয়ে আসছে ইসলামাবাদ।
অন্যদিকে আফগান কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে উল্টো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্ত লঙ্ঘন এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলে। কাবুলের দাবি, পাকিস্তানের সামরিক অভিযান সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দুই দেশের সংঘাত ও সীমান্ত উত্তেজনার ঘটনায় অন্তত ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ৩৯৭ জন। এই পরিসংখ্যান সীমান্ত অঞ্চলের মানবিক পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস কেবল নিরাপত্তা সংকটই তৈরি করছে না, বরং বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গত অক্টোবরে সহিংসতা বাড়ার পর থেকে দুই দেশের সীমান্ত বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকায় বাণিজ্য কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সর্বশেষ হামলার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—দুই দেশ কি আবারও বৃহত্তর সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে? আপাতত সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, তারা এখনও নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন।

