মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন এক মোড়ে পৌঁছেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি সব ধরনের নৌযানের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দেশটির সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড এ ঘোষণা দেয়, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো তেলবাহী ট্যাংকার, বাণিজ্যিক জাহাজ কিংবা অন্য কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না। এমনকি কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ওই জলপথ অতিক্রমের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
এই ঘোষণার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার নতুন অধ্যায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে বুধবার (১০ জুন) গভীর রাতে ইরানের একাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়। ওয়াশিংটনের দাবি, এটি ছিল ইরানের ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের জবাব।
অন্যদিকে তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রই সংঘাতকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাসহ হরমুজ প্রণালির দুটি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং সিরিক এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। কারগান শহরেও বিস্ফোরণে অন্তত দুজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র গত এপ্রিলে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইআরজিসির ভাষ্যমতে, এটি কেবল সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানি হয়, তার বড় অংশ এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করে। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য এই রুট বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এই জলপথ বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, উত্তেজনা কি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে, নাকি এটি আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেবে। আপাতত বিশ্বজুড়ে সরকার, বিনিয়োগকারী এবং জ্বালানি বাজারের অংশগ্রহণকারীরা পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছেন।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে আগামী কয়েক দিন শুধু অঞ্চলটির নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

