প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সফরটি শুধু বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার দিক থেকেই নয়, বরং এর সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও ব্যাপক বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে। বিশেষ করে মোংলা বন্দর, তিস্তা নদী প্রকল্প, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডোর এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলোকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যে পরিবর্তনের আভাস মিলেছে, তারই ধারাবাহিকতায় বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ স্পষ্ট হয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের অগ্রগতি ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে প্রায় ১১০ একর জমিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই জমি একসময় ভারতের জন্য বরাদ্দ থাকলেও ২০২৫ সালে সেই বরাদ্দ বাতিল করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবেই মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বেড়েছে। পাকিস্তানের গোয়াদর থেকে আফ্রিকার জিবুতি পর্যন্ত বিভিন্ন বন্দরে চীনের বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় মোংলাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে বলে ভারতীয় পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সমান গুরুত্ব পেয়েছে। সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা কামনা করেন। ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা শুধু পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত।
বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডোরের নিকটবর্তী হওয়ায় তিস্তা অববাহিকায় চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নয়াদিল্লির জন্য সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে প্রকল্পটি শুধু উন্নয়ন নয়, নিরাপত্তা ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও ভারতের নজরে রয়েছে।
চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন খাতে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নদী ব্যবস্থাপনাসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায় হিসেবেও দেখছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ চীনের তৈরি ২৪টি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ের নিয়মিত সংলাপ চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নের ঘোষণা এখনো আসেনি, তবুও সম্ভাব্য সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই বক্তব্যকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে এবং এটিকে আঞ্চলিক কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
তবে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পরিবর্তে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশলের দিকেই এগোচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে চীনের সহযোগিতা গ্রহণের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও সমানভাবে ধরে রাখতে আগ্রহী ঢাকা।
এদিকে ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। নতুন হাইকমিশনারের মাধ্যমে পর্যটক ভিসা চালুর ঘোষণা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং জ্বালানি খাতে যৌথ কার্যক্রমকে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক যত গভীর হবে, ততই ভারত, চীন এবং পুরো অঞ্চলের কূটনৈতিক ভারসাম্য নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

