মিয়ানমারের জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি অঞ্চলের একটি বিদ্রোহী ঘাঁটিতে আশ্রয় নিয়েছে চার তরুণ। তাদের চোখে ক্লান্তি আছে, আছে শঙ্কাও। কেউই নিজের ইচ্ছায় এই যুদ্ধে নামেনি। তবু ভাগ্যের নির্মম মোড়ে তারা এখন গৃহযুদ্ধের অংশ। চারজনের গল্প আলাদা হলেও তাদের অভিজ্ঞতার মূল সুর এক—বাধ্য করা হয়েছে, ঠেলে দেওয়া হয়েছে, আর শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সামনের সারিতে দাঁড় করানো হয়েছে।
এই তরুণদের একজন ছিলেন রাঁধুনি। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পরিচয়পত্র না থাকায় তাকে আটক করা হয়। এরপর জোর করে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করানো হয়। আরেকজনকে গভীর রাতে কারাওকে আসর থেকে ফেরার সময় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তৃতীয়জন বন বিভাগে কাজ করতেন। চতুর্থজনের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় তার জুতোর ভেতর মাদক ঢুকিয়ে দিয়ে পরে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়। ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী এই চার তরুণের একজন বলেছেন, কী ঘটছে তা বোঝার আগেই তাদের যুদ্ধের সম্মুখভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তাদের ভাষায়, স্বাভাবিক জীবন থেকে যুদ্ধজীবনে নিক্ষেপের এই অভিজ্ঞতা ছিল আতঙ্কজনক। এক তরুণ জানান, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেক কিছু করানো হতো। সকাল, দুপুর, রাত—কোনো সময়ই ঠিকমতো বিশ্রাম মিলত না। বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগপ্রাপ্তরাই মূলত সব কাজ করত, আর নিয়মিত সৈন্যদের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অর্থাৎ, এই নতুন সেনাদের শুধু অস্ত্রধারী নয়, শ্রমিক, রসদবাহী, শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মী—সব ভূমিকায় ব্যবহার করা হচ্ছিল।

চার মাসের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কারেন রাজ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এক রাতে গোসল করতে যাওয়ার পথে তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু পালানোর পরও মুক্তি পুরোপুরি আসেনি। পরে পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের একটি টহলদলের হাতে তারা আটক হন। তবে বিদ্রোহীদের ছাউনিতে এসে তাদের অনুভূতি বদলে যায়। তাদের ভাষ্য, সেখানে তাদের সঙ্গে অপরিচিতের মতো নয়, বরং ভাইয়ের মতো আচরণ করা হচ্ছে। আপাতত তারা বিদ্রোহী শিবিরেই থাকবে, পরে থাইল্যান্ড সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হবে। কারণ, তাদের একজনের ভাষায়, এখন ফিরে গেলে সামরিক বাহিনী তাদের খুঁজে বের করবে।
পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন থাকলেও তাদের অভিজ্ঞতা মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের গভীর বাস্তবতা সামনে এনে দেয়। ২০২১ সালে সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করার পর থেকে দেশজুড়ে সংঘাত ক্রমেই তীব্র হয়েছে। অং সান সুচির কারাবন্দি হওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; সেটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সূচনা, যার ভেতরে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, আর দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক মানচিত্র বারবার বদলেছে।
দুই বছরেরও বেশি সময় আগে নানা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদ্রোহী জোট একের পর এক এলাকা দখল করে জান্তাকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। তখন মনে হচ্ছিল, সরকারবিরোধী শক্তিগুলো দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের গতিপথ এখন উল্টো দিকে ঘুরছে। দেশের অনেক অঞ্চলে প্রতিরোধ যোদ্ধারা এখন রক্ষণাত্মক অবস্থানে। সামরিক বাহিনী এখনো পুরো দেশের অর্ধেকের বেশি অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে দখল করতে পারেনি, কিন্তু তারা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহর পুনর্দখল করেছে। উত্তরাঞ্চলে মান্দালয় থেকে মিতকিনা পর্যন্ত সড়কের নিয়ন্ত্রণও আবার তাদের হাতে এসেছে। একই সঙ্গে কাচিন, চিন ও কারেন রাজ্যসহ সীমান্ত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এই নতুন পরিস্থিতিতে বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি। পিডিএফ ব্যাটালিয়নের এক কমান্ডার বলেছেন, ২০২৪ সালে এই নীতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে যুদ্ধের হিসাব বদলে গেছে। তাঁর কথায়, বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনী কার্যত সীমাহীন জনবল পেয়ে যাচ্ছে। বিদ্রোহীদের প্রযুক্তি বা কৌশলে কিছু সুবিধা থাকলেও অর্থ, অস্ত্র, সরঞ্জাম ও লোকবলের দিক থেকে তারা স্পষ্টভাবেই পিছিয়ে। তারা সহজে নতুন যোদ্ধা নিয়োগ করতে পারে না, অথচ জান্তা নিরন্তর নতুন মানুষ টেনে আনতে পারছে।
এই জনবল-সুবিধা শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে বেশি সৈন্য মানে বেশি পাহারা, বেশি টহল, বেশি চাপ, আর প্রতিরোধপক্ষের জন্য ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকা চলাচলের পথ। হপাপুন শহর ও একটি বড় সামরিক ঘাঁটি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে এলেও সেখানকার যুদ্ধক্ষত এখনও স্পষ্ট। স্কুল, বৌদ্ধ বিহার, বাড়িঘর, প্রবেশপথের স্বাগতফলক—সবখানেই আক্রমণের চিহ্ন রয়েছে। আর এখন সেই অঞ্চলেই আবার আকাশে জান্তার ড্রোন টহল দিচ্ছে, আর প্রায় ২ হাজার সৈন্য অগ্রসর হচ্ছে।
এখানে শুধু সৈন্যসংখ্যা বাড়ছে না, যুদ্ধের চরিত্রও পাল্টাচ্ছে। বিদ্রোহী কমান্ডার দা ওয়া বলছেন, অনিচ্ছায় আসা অনেক সৈন্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ হয়ে উঠছে। কারণ তারা নিয়মিত প্রশিক্ষণ পাচ্ছে, শৃঙ্খলার মধ্যে থাকছে, আর আদেশ মানতে শিখছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এখনকার যুদ্ধ আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। সামরিক বাহিনী আশপাশের এলাকায় অবস্থান শক্ত করছে, আর তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের দিকে প্রায় ৪০০ সৈন্য এগিয়ে আসছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আকাশযুদ্ধের নতুন বাস্তবতা। দা ওয়া জানান, রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির পর জান্তার বিমানশক্তি অনেক বেড়েছে। আগে আকাশে একটি যুদ্ধবিমান দেখা গেলেই তা বড় ঘটনা ছিল। এখন একসঙ্গে দুই বা ততোধিক বিমান দেখা যাচ্ছে। ড্রোনের ব্যবহারও দ্রুত বেড়েছে। তার মতে, ড্রোনের সংখ্যা এবং সক্ষমতা—দুটোতেই জান্তা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। কো কাওংও একই মত দেন। তিনি বলেন, যদি জ্যামার থাকত, তবে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হতো। কিন্তু বাস্তবে বিদ্রোহীদের কাছে সেই ধরনের প্রযুক্তি খুবই সীমিত। ফলে ড্রোন হুমকি মোকাবিলা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

অস্ত্রের সরবরাহও এখন বড় সংকট। চীনের মধ্যস্থতায় কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হলেও সেই চুক্তি প্রতিরোধপক্ষের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করেছে। একদিকে কিছু গোষ্ঠী হামলা কমাতে বাধ্য হয়েছে, অন্যদিকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রবাহও সীমিত হয়েছে। চীন যেখানে মিয়ানমারে বড় বিনিয়োগকারী, সেখানে তাদের কূটনৈতিক প্রভাবও কম নয়। কারেন ও কাচিন রাজ্যে বিরল খনিজ উত্তোলনের পাশাপাশি প্রতিরোধযোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র পৌঁছানোর পথেও নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদ্রোহীদের সরবরাহব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়েছে।
আহত প্লাটুন কমান্ডার কিয়ার সোয়ের কথা এই সংকটকে খুব স্পষ্টভাবে বোঝায়। যুদ্ধের একটি ভিডিও দেখাতে দেখাতে তিনি বলেছেন, গুলি বাঁচিয়ে ব্যবহার করতে হবে। পরে হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে তিনি জানান, সবাই লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত, কিন্তু অস্ত্র ও গোলাবারুদের অভাব তাদের বড় দুর্বলতা। স্থলমাইনে পা পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন, ডান পায়ের গোড়ালির বড় অংশ উড়ে যায়। চিকিৎসকেরা ধাতব ব্র্যাকেট ও পিন দিয়ে তার পা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। এটি তাঁর দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার। তীব্র ব্যথার মধ্যেও তাঁর মনোভাব বদলায়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি আবার যুদ্ধে ফিরবেন।
মিয়ানমার এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাইন আক্রান্ত দেশগুলোর একটি। শুধু গত বছরই স্থলমাইনে ৭৪৫ জন নিহত বা আহত হয়েছে, আর তাদের প্রতি চারজনের একজন শিশু। এই সংখ্যা দেখায়, যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনেও গভীর ক্ষত তৈরি করছে। ভূমির নিচে লুকিয়ে থাকা মাইন, আকাশে ঘুরে বেড়ানো ড্রোন, আর নতুন করে আগত বাধ্যতামূলক সৈন্য—সব মিলিয়ে মিয়ানমারের যুদ্ধ আরও বিপজ্জনক, আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
বিদ্রোহীদের সীমিত সামর্থ্যের একটি ফিল্ড হাসপাতালও এই বাস্তবতার প্রতীক। বাঁশ ও কাঠের কয়েকটি ঘর, সৌরবিদ্যুৎচালিত ও ব্যাকআপ জেনারেটরচালিত অপারেশন থিয়েটার—এই সামান্য ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা চলছে। কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই, অর্থ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট প্রবল। তবু এই হাসপাতালে কাজ করা ডাক্তার সাউং তরুণ যোদ্ধাদের বলছেন, এই বিপ্লব জরুরি ছিল। তাঁর মতে, আগের প্রজন্ম দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলেই আজকের তরুণদের সামনে এই কঠিন বাস্তবতা এসেছে। তার ভাষায়, তরুণরা যদি এখনই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে না দাঁড়ায়, তাহলে একদিন তাদেরও একই নিপীড়নের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হতে পারে।
আর এই যুদ্ধের মধ্যেই নতুন জীবন এসেছে। হাসপাতালের এক কোণে মাটির ওপর তৈরি মাচায় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কষ্টে কাতরাচ্ছিলেন এক যোদ্ধার স্ত্রী। ২৯ বছর বয়সী মে কিউত মন আর তাঁর ২৪ বছর বয়সী স্বামী ইয়াইন চিত—দুজনেই চান তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্যরকম হোক। সন্তান জন্মের সময় বৌদ্ধ মন্ত্র পাঠের রীতি থাকলেও ইয়াইন চিত সেগুলো মনে করতে পারেননি। তাই মোবাইল ফোনে মন্ত্র চালিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর এক কন্যাশিশুর জন্ম হয়। তার নাম রাখা হবে সু পায়ে, যার অর্থ পূরণ হওয়া ইচ্ছা।
এই নামটি কেবল একটি শিশুর নাম নয়; এটি মিয়ানমারের হাজারো পরিবারের অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চান তাদের মেয়ে একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে বড় হোক। তবে তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ এখনো দীর্ঘ। কারণ পরিবারটি জান্তা-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকে, আর যুদ্ধের কারণে দুই পরিবারের সঙ্গে দেখা করাও এখন সহজ নয়। তবু ইয়াইন চিতের কণ্ঠে আশার ছাপ আছে। তিনি বলেন, বিপ্লব শেষ হবে, শান্তি ফিরবে, আর তখন তারা তাদের সন্তানকে নিয়ে দুই পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন।
মিয়ানমারের যুদ্ধ তাই এখন শুধু বন্দুকের সংঘর্ষ নয়। এটি জনবল, প্রযুক্তি, সরবরাহ, মনোবল আর ভবিষ্যতের লড়াই। বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি জান্তার হাতে নতুন শক্তি যোগ করলেও যুদ্ধের শেষ কথা এখনো লেখা হয়নি। বিদ্রোহীরা লড়ছে, আহতরা ফিরতে চাইছে, চিকিৎসকেরা টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, আর একটি নবজাতক হয়তো সেই ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করছে, যেখানে এই দেশ একদিন আবার শান্ত হবে।

