মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন এক মোড়ে পৌঁছাতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে। এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার খবর সামনে আসছে, তখন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেই আলোচনায় ট্রাম্প স্পষ্টভাবে যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এবং জানান, ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প মনে করেন, তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত। তিনি নেতানিয়াহুকে বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। তাই সংঘাত অব্যাহত রাখার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
এই ফোনালাপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমাগত অস্থির হয়ে উঠেছে। ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা পুরো অঞ্চলকে নতুন সংঘাতের আশঙ্কার মুখে ঠেলে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরিস্থিতি হয়তো নতুন দিকে মোড় নিতে পারে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচনার সময় নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার পথে যুক্তরাষ্ট্রকে থামানো তার পক্ষে সহজ হবে না। ওয়াশিংটন বর্তমানে সংঘাত নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনাকে ঘিরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আশাবাদী খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, দুই দেশ ইতোমধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামোর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা সফরে যেতে পারেন। যদি সেই সফর বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে আলোচনার পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলে তবেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও কিছু কারিগরি ও রাজনৈতিক বিষয় অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। সেসব বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। সামরিক সংঘাত অব্যাহত রাখার পরিবর্তে তিনি এখন আলোচনার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে ঝুঁকছেন বলে মনে হচ্ছে। এর পেছনে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আসন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি তেহরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়, তাহলে তা ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধ ও প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে সরে এসে যদি আলোচনার পথ সত্যিই শক্তিশালী হয়, তাহলে সেটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। এখন নজর থাকবে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সম্ভাব্য সমঝোতার দিকে।

