ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বরং উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্র। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নতুন নতুন মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬১ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ৩৩ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২২১ জন।
শনিবার (১৩ জুন) দেশটির কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ এই তথ্য প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ এখনও অব্যাহত রয়েছে। ধসে পড়া ভবন, ভূমিধস এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছাতেই উদ্ধারকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবুও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
দেশটির সিভিল ডিফেন্স অফিস জানিয়েছে, বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও কয়েকটি মরদেহ উদ্ধারের পর মৃতের সংখ্যা বেড়েছে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক মানুষ আটকে থাকতে পারেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে বারবার অনুভূত হওয়া পরাঘাত। প্রতিটি নতুন কম্পন উদ্ধারকর্মীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এখনও অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো সময় আরও ধসে পড়তে পারে। তবুও জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশায় দিনরাত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, মিন্দানাও অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ ৫৩ হাজার মানুষ এই ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রায় ৯ হাজার ৩৯৩ জন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন, আর ৫৪ হাজার ২৭৪ জন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের বাড়িতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন।
প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে অন্তত ৮ হাজার ৮৬৫টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া আরও ৩৬ হাজার ৬৯১টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু বাড়িঘর নয়, স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি ভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে মিন্দানাও উপকূলের কাছে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। কম্পনের তীব্রতায় মুহূর্তের মধ্যে বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। আতঙ্কে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। অনেক পরিবার এখনও নিজেদের বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছে না, কারণ পরাঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।
জেনারেল সান্তোস সিটি ও সারাঙ্গানি প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব এলাকায় দুর্যোগজনিত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। দ্রুত ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হলেও ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার কারণে সংকট কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও ফিলিপাইনের সামনে এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। হাজারো পরিবারকে পুনর্বাসন, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে। আপাতত পুরো দেশের নজর উদ্ধার অভিযানের দিকে, কারণ এখনও অনেক পরিবার তাদের স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছে।

