পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ার উত্তর ওয়াজিরিস্তান জেলায় টানা তিন দিনের সামরিক অভিযানে অন্তত ২১ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। নিহতদের মধ্যে চারজনকে গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা পাকিস্তানি বাহিনীর মতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাফল্য।
শনিবার পাকিস্তানের সামরিক জনসংযোগ দপ্তরের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম সক্রিয় ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, নিহত চার নেতার নাম খালিদ রেজা ওরফে সালার, মুফতুন, মুসা এবং ইমরান ওরফে আয়ান। তারা সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিক-ই তালিবান পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং উত্তর ওয়াজিরিস্তান অঞ্চলে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, এসব নেতা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত একাধিক হামলা এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ কারণেই তাদের নির্মূল করা প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর ওয়াজিরিস্তান বহু বছর ধরেই পাকিস্তানের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রবিন্দু। আফগান সীমান্তঘেঁষা এই দুর্গম এলাকায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বারবার ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। ফলে সেখানে পরিচালিত প্রতিটি সফল অভিযান শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানি বাহিনী জানিয়েছে, গত সপ্তাহেও খাইবার পাখতুনখোয়ার মিরান শাহ এলাকায় পৃথক অভিযানে ২৭ জন জঙ্গি নিহত হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ধারাবাহিকভাবে জঙ্গিবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে ইসলামাবাদ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে অস্থির অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়ায় তেহরিক-ই তালিবান পাকিস্তানের তৎপরতা এবং বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর হামলা দেশটির জন্য বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২১ সালের পর থেকে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালকে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই বছরজুড়ে দেশটিতে ৪৪টি বড় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে, যা গত এক দশকের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি ছিল।
সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধির পেছনে পাকিস্তান বরাবরই প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তানের ভূমিকার অভিযোগ তুলেছে। তবে দুই দেশই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ফলে নিরাপত্তা ইস্যু শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আঞ্চলিক কূটনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান বর্তমানে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা, অন্যদিকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এ কারণে সামরিক অভিযানগুলো দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অন্যতম প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, উত্তর ওয়াজিরিস্তানসহ খাইবার পাখতুনখোয়ার বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্য হলো অঞ্চলটিতে সক্রিয় সশস্ত্র নেটওয়ার্কগুলোকে সম্পূর্ণভাবে দুর্বল করে ফেলা এবং ভবিষ্যৎ হামলার সক্ষমতা নষ্ট করা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামরিক অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় সামরিক সাফল্যের পরও নতুন করে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থানের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

