যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কি অবশেষে সংঘাতের পথ ছেড়ে সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে? গত কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতা দেখে এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনার পাশে এখনো বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলছে। ওয়াশিংটন আশাবাদী, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে; কিন্তু তেহরান এখনো সময়, শর্ত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত থামাতে একটি রূপরেখা চুক্তির প্রস্তুতি চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, চুক্তিটি পরদিন, অর্থাৎ ১৪ জুন ২০২৬ রোববার সই হওয়ার কথা। দিনটি তার ৮০তম জন্মদিনও। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, দুই পক্ষ শান্তি চুক্তির একটি রূপরেখায় সম্মত হয়েছে এবং ইসলামাবাদ রোববার বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে সইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপর পরবর্তী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা।
তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। ইরান এখনো রোববার চুক্তি সইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি ট্রাম্পের ঘোষণার আগেই সময় নিয়ে সতর্ক মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, “এটি আগামীকাল হবে না”, তবে “আগামী কয়েক দিনের মধ্যে” হতে পারে।
এই এক বাক্যই পুরো পরিস্থিতির জটিলতা বুঝিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ঘোষণা দিতে চাইছে। পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সাফল্যের বার্তা দিতে চাইছে। কিন্তু ইরান অভ্যন্তরীণ চাপ, সামরিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক শর্ত এবং রাজনৈতিক মর্যাদার হিসাব কষে ধীরে এগোতে চাইছে।
চুক্তির কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি
সম্ভাব্য রূপরেখা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন এই প্রণালি দিয়ে হতো। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়। হরমুজ প্রণালি শুধু আঞ্চলিক নৌপথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শ্বাসনালি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তি সই হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য খুলে দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো—ইরান প্রণালি খুলবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নৌ অবরোধ তুলে নেবে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে—এটি একটি আবশ্যিক শর্ত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রণালি কোনো বাড়তি মাশুল ছাড়াই খুলে দেওয়া যেতে পারে। ইরান সে পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রও অবরোধ প্রত্যাহার করবে।
তবে শুধু প্রণালি খোলা যথেষ্ট নয়। পরবর্তী ধাপে সেখানে পাতা বিস্ফোরক সরানোর কাজও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শিল্পোন্নত প্রধান শক্তিধর দেশগুলোর জোট এ কাজে ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, চুক্তি সই হলেও বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। কাগজে শান্তি আসা আর সমুদ্রে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এক জিনিস নয়।
যুদ্ধের চাপ ও সমঝোতার বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় ইরানের সামরিক-শিল্পভিত্তি বড় আঘাত পেয়েছে বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের দাবি। ইরানের সামরিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তারা মনে করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন, যুদ্ধের ফলে ইরানের কঠোরপন্থী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর প্রভাব আগের চেয়ে আরও দৃঢ় হয়েছে।
এটি তেহরানের জন্য বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাইরে থেকে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ শান্তিচুক্তির দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু ভেতরে কঠোরপন্থীরা মনে করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা মানে আত্মসমর্পণ। ফলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সামরিক নেতৃত্ব, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও কঠোরপন্থী রাজনীতির মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইরানি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, চুক্তিবিরোধীরা তেহরানের বিভিন্ন চত্বর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে জড়ো হয়েছে। তারা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্লোগান দিয়েছে। এসব ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে প্রতিবাদের খবর ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ শহরের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, কিছু বিক্ষোভকারী আপসকামীদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে এবং আরাকচির পদত্যাগ দাবি করেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, সম্ভাব্য চুক্তি শুধু আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
ইরানের ভেতরের ক্ষোভ কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী রাজনীতি শুধু সরকারের প্রচার নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ওয়াশিংটনবিরোধিতা ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর একটি প্রধান ভিত্তি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা কঠোরপন্থীদের চোখে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে আব্বাস আরাকচির অবস্থান খুব সূক্ষ্ম। তিনি একদিকে ইরানের জন্য অর্থনৈতিক ছাড়, জব্দ সম্পদ ফেরত, তেল রপ্তানিতে সুবিধা এবং অবরোধ প্রত্যাহারের সুযোগ তৈরি করতে চাইছেন। অন্যদিকে তাকে এমনভাবে আলোচনা চালাতে হচ্ছে, যাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে না হয়।
যুদ্ধ শেষে কোনো দেশ যদি শান্তি আলোচনায় যায়, তখন জনগণের একটি অংশ স্বস্তি পায়। কিন্তু আরেক অংশ প্রশ্ন তোলে—এত ক্ষয়ক্ষতির পর কী পাওয়া গেল? ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি তেমনই। সরকার যদি চুক্তিকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে না পারে, তাহলে অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়তে পারে।
১৩ জুন শুক্রবার আরাকচি বলেন, চুক্তিতে এখনো পরিবর্তন আসতে পারে, তবে প্রাথমিক সমঝোতা দেখিয়েছে যে ইরান সংঘাত থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে এসেছে। এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—সমঝোতাকে দুর্বলতা নয়, বরং ইরানের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা।
যুক্তরাষ্ট্র কী পেতে চায়
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এই চুক্তির মূল লক্ষ্য কয়েকটি। প্রথমত, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পরবর্তী আলোচনায় আনা। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চুক্তির কাঠামো দাঁড় করানো।
ট্রাম্প যুদ্ধের একটি প্রধান কারণ হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কথা বলেছেন। কিন্তু প্রস্তাবিত রূপরেখায় পারমাণবিক প্রশ্নটি প্রথম ধাপে সমাধান করা হচ্ছে না। বরং হরমুজ প্রণালি ও অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয় আগে আসছে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে পরে, ৬০ দিনের আলোচনাপর্বে।
এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একসঙ্গে সব সমস্যা সমাধান করতে গেলে চুক্তি ভেঙে যেতে পারে। তাই প্রথমে এমন একটি বিষয় বেছে নেওয়া হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য জরুরি—হরমুজ প্রণালি। এরপর ধাপে ধাপে কঠিন বিষয়, বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেছেন, শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়ার দিকে যাবে। তার দাবি, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস ও সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে ইরান এই ব্যাখ্যা কতটা মেনে নেবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ইরান কী পেতে পারে
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় অর্থনীতি। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ দেশটির অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলেছে। তাই জব্দ সম্পদ ছাড়, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহার তেহরানের জন্য বড় অর্জন হতে পারে।
খসড়া শর্ত সম্পর্কে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিলে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকশ কোটি ডলারের জব্দ ইরানি সম্পদ ছাড় শুরু করবে এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করবে। ইরানের ফারস সংবাদ সংস্থা বাঘায়িকে উদ্ধৃত করে জানায়, ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড় এই চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিতে সেবার জন্য ইরানকে মাশুল নিতে হবে।
এখানে ইরানের আরেকটি অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বাঘায়ি বলেছেন, অঞ্চলে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি শেষ হতে হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এই দাবির মাধ্যমে ইরান শুধু অর্থনৈতিক ছাড় নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও নিজের অবস্থান জানাচ্ছে।
ইরান চাইছে চুক্তি যেন শুধু তার দায়বদ্ধতার তালিকা না হয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, সম্পদ ছাড়, তেল রপ্তানির সুযোগ এবং আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি নিয়ে আলোচনাও যেন এতে থাকে। এতে তেহরান অভ্যন্তরীণভাবে বলতে পারবে—এটি একতরফা ছাড় নয়, বরং পারস্পরিক সমঝোতা।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা কেন তাৎপর্যপূর্ণ
এই আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, দুই পক্ষ শান্তিচুক্তির রূপরেখায় সম্মত হয়েছে এবং ইসলামাবাদ বৈদ্যুতিক সইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা আঞ্চলিক কূটনীতিতে ইসলামাবাদের গুরুত্ব বাড়াতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য এটি সুযোগও বটে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা যাবে। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে পাকিস্তান নিজেকে শান্তি-প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরতে পারলে তা তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য লাভজনক হবে।
তবে মধ্যস্থতা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। ঘোষণা করা সহজ, বাস্তবায়ন কঠিন। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন মাঠে সংঘর্ষ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সংঘর্ষ এখনো থামেনি
চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও সংঘাতের বাস্তবতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। গত দুই দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতার দিকে এগোলেও সামরিক উত্তেজনা চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী হরমুজ প্রণালির দিকে যাওয়া ইরানের একাধিক একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। এর অর্থ, আলোচনার টেবিল প্রস্তুত হলেও আকাশ ও সমুদ্রে উত্তেজনা তখনো বাস্তব।
এদিকে ইসরায়েল বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তির পক্ষ নয়। শনিবার ইসরায়েল জানায়, তারা ২৪ ঘণ্টায় লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ৭০টির বেশি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের এই অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধও সামনে এসেছে। ওয়াশিংটন চায় তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতে লেবাননে ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপ সীমিত করুক। কিন্তু ইসরায়েল ইরানের মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে আগ্রহী।
এখানে বড় সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় পৌঁছায়ও, অঞ্চলটির অন্য পক্ষগুলো সেই সমঝোতা মেনে চলবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। ইসরায়েল, হিজবুল্লাহ, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির হিসাব আলাদা। ফলে একটি রূপরেখা চুক্তি পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে—এমন ভাবা এখনো আগেভাগে বলা হবে।
পারমাণবিক আলোচনার কঠিন পথ
এই সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে কঠিন অংশ এখনো সামনে আসেনি। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং অবরোধ প্রত্যাহার তুলনামূলকভাবে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা অনেক বেশি জটিল।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সন্দেহ, এই কর্মসূচি অস্ত্র সক্ষমতার দিকে যেতে পারে। এই অবিশ্বাসের ইতিহাস বহু বছরের। তাই ৬০ দিনের আলোচনাপর্বে শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, রাজনৈতিক আস্থা, যাচাই ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ধাপ—সবকিছু নিয়েই কঠিন দর-কষাকষি হবে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানো বা ধ্বংস করা হোক। ইরান চাইবে তার সার্বভৌম অধিকার ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা স্বীকৃত থাকুক। দুই পক্ষের ভাষা, উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক প্রয়োজন আলাদা। তাই প্রথম ধাপের চুক্তি সই হলেও দ্বিতীয় ধাপে বড় বাধা আসতে পারে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাব
ট্রাম্পের জন্য এই চুক্তি শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়; এটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সাফল্যের দাবিও হতে পারে। ১৪ জুন ২০২৬, তার ৮০তম জন্মদিনে যদি চুক্তি সই হয়, তাহলে তিনি এটিকে বড় ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখাতে চাইছেন, তার চাপের কূটনীতি ফল দিয়েছে। যুদ্ধ, অবরোধ ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের পর তিনি শান্তির শর্ত নির্ধারণ করেছেন—এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা তিনি দিতে পারেন।
তবে ঝুঁকিও আছে। যদি ইরান শেষ মুহূর্তে সই পিছিয়ে দেয়, অথবা চুক্তির শর্ত নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়, তাহলে ট্রাম্পের ঘোষণাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকবার বলেছে, ইরান চুক্তির কাছাকাছি; কিন্তু তেহরান তা খণ্ডন বা নরম ভাষায় ব্যাখ্যা করেছে। তাই এবারও সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
তেহরানের সতর্কতা
ইরান কেন দ্রুত নিশ্চিত করছে না? এর কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। কঠোরপন্থীদের বিরোধিতা উপেক্ষা করা সহজ নয়। দ্বিতীয়ত, ইরান চায় না যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই বিজয় ঘোষণা করুক। তৃতীয়ত, চুক্তির ভাষা ও বাস্তবায়নের ধাপ নিয়ে এখনো দর-কষাকষি থাকতে পারে। চতুর্থত, তেহরান চাইবে জব্দ সম্পদ ছাড়, তেল রপ্তানি, অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা—সব বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা।
ইরানের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি কতটা পালন করবে? অতীতের অভিজ্ঞতা তেহরানকে সতর্ক করেছে। কোনো চুক্তি সই হলেও ভবিষ্যৎ প্রশাসন তা বদলে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা ইরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সবসময় থাকে।
চুক্তি হলে কী বদলাবে
যদি চুক্তি সই হয়, প্রথম প্রভাব পড়বে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে তেল পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ কমবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। জব্দ সম্পদ ছাড় ও তেল রপ্তানির সুযোগ পেলে দেশটির আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংঘাত থেকে কূটনৈতিক পথে আসার দাবি করতে পারবে। এতে ওয়াশিংটন আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বার্তা দেবে।
চতুর্থত, পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কূটনৈতিক লাভ পেতে পারে।
তবে সবকিছু নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কাগজে সই মানেই মাঠে শান্তি নয়। হরমুজ প্রণালি নিরাপদ করা, অবরোধ প্রত্যাহার, সম্পদ ছাড়, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, পারমাণবিক আলোচনা—সব ধাপেই নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চুক্তি না হলে কী হতে পারে
যদি চুক্তি পিছিয়ে যায় বা ভেঙে পড়ে, পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক হতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল বাজারে চাপ বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ বজায় রাখবে। ইরান পাল্টা চাপের পথ নিতে পারে। ইসরায়েল ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা বাড়াতে পারে। এতে সংঘাত আবারও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
অভ্যন্তরীণভাবেও ইরানের সরকার চাপে পড়তে পারে। কঠোরপন্থীরা বলবে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা ভুল ছিল। আবার সাধারণ মানুষ যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে ক্লান্ত হলে তারা দ্রুত স্বস্তি চাইবে। ফলে তেহরানের জন্য ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শান্তির দরজা অল্প খুলেছে, কিন্তু দরজার ওপারে পথ এখনো কুয়াশায় ঢাকা। ওয়াশিংটন দ্রুত চুক্তি ঘোষণা করতে চায়। পাকিস্তান মধ্যস্থতার সাফল্য দেখাতে চায়। তেহরান সময় নিয়ে নিজের শর্ত নিশ্চিত করতে চায়। আর ইরানের ভেতরে কঠোরপন্থীরা সমঝোতাকে সন্দেহের চোখে দেখছে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ছাড় এবং পারমাণবিক আলোচনার ৬০ দিনের পথ—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক সমঝোতা নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, বৈশ্বিক তেলবাজার, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বড় চুক্তির সম্ভাবনা।
তবে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, ১৪ জুন ২০২৬ রোববার চুক্তি সই হবে কি না। যুক্তরাষ্ট্র আশাবাদী, পাকিস্তান প্রস্তুত, কিন্তু ইরান এখনো সাবধানী। তাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে সঠিক মূল্যায়ন হলো—চুক্তি কাছে এসেছে, কিন্তু নিশ্চিত হয়নি।
যদি চুক্তি হয়, সেটি হবে সংঘাতের পর কূটনীতির বড় প্রত্যাবর্তন। আর যদি না হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা আবারও বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।

