মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বহু মাস ধরে চলা সংঘাত অবসানের দিকে এগোতে পারে।
১৫ জুন ভোরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে এবং আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। তার এই ঘোষণার পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সমঝোতার বিষয়ে আশাবাদী অবস্থান প্রকাশ করেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার কথা উল্লেখ করেন এবং সেখানে বিদ্যমান সামরিক অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে ব্যাপক উদ্বেগ ছিল। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে উত্তেজনা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে এই রুট পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে এখনো ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। যদিও দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে চুক্তি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তবুও তেহরানের পক্ষ থেকে বিস্তারিত অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি। এর ফলে চুক্তির বাস্তবতা ও চূড়ান্ত রূপ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই সমঝোতাকে দেশটির কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তাদের মতে, দীর্ঘ চাপ ও সংঘাতের মধ্যেও ইরান নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এই সম্ভাব্য সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোর বড় অর্জন হিসেবে দেখাতে চাইছে।
এই সমঝোতার পেছনে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার ঘটনা নতুন করে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল। ওই হামলার সমালোচনা করেছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, এমন একটি সময়ে ওই হামলা হওয়া উচিত হয়নি, যখন শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হচ্ছিল।
অন্যদিকে ইরানের আলোচক ও সরকারি কর্মকর্তারাও ওই হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আলোচনার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা সম্ভাব্য এই চুক্তির অংশ নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা বদলাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলেও অঞ্চলটির অন্যান্য সংঘাতময় ইস্যুগুলো সমাধান করতে আরও সময় লাগবে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য চুক্তির খসড়ায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের ওপর কিছু সামরিক ও অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানো। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও ৬০ দিন আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে থাকা প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করার বিষয় বিবেচনা করতে পারে। বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দেবে বলে জানা গেছে। এছাড়া চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা নতুন পারমাণবিক স্থাপনা সম্প্রসারণ না করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে।
তবে এসব তথ্যের অনেকগুলোই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে যেকোনো মুহূর্তে নতুন শর্ত বা পরিবর্তন আসতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই সম্ভাব্য সমঝোতা একটি বড় মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদি সত্যিই চুক্তিটি কার্যকর হয়, তাহলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কই নয়, বরং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।
এখন বিশ্বজুড়ে নজর ১৯ জুনের দিকে। সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত সেই বৈঠকে কী ঘটে এবং দুই দেশ কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতার নতুন দিক।

