ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন গতি পেলেও মাঠের বাস্তবতা এখনো ভয়াবহ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার একদিন পরই ইউক্রেনজুড়ে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
সোমবার ভোরে চালানো এই হামলাকে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে কিয়েভের ওপর সবচেয়ে বড় রুশ আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ। হামলার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো কিয়েভের ঐতিহাসিক ‘কিয়েভ পেচেরস্ক লাভরা’ মঠে আগুন লাগা। ১০৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মঠ ইউক্রেনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক এবং এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত।
ইউক্রেনের রাজধানীর সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো জানান, সরাসরি হামলায় মঠটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর বিশাল আগুনের শিখা আকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আশপাশের মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া স্বিরিদেঙ্কো এই হামলাকে শুধু সামরিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপরও আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, এটি ইউক্রেনের জনগণ ও ইতিহাসের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক নির্মম আক্রমণ।
হামলায় কিয়েভের একাধিক আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন নষ্ট হওয়ায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় পড়েছেন। রাজধানীতে চারজন নিহত এবং ২৩ জন আহত হওয়ার খবর দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
ইউক্রেনের অর্থোডক্স চার্চের প্রধান মেট্রোপলিটন এপিফানি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান হামলা বন্ধে বিশ্বের এখন সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
রুশ হামলার প্রভাব শুধু ইউক্রেনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিবেশী পোল্যান্ডও সাময়িকভাবে নিজেদের যুদ্ধবিমান আকাশে পাঠায়। সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সতর্কতা জারি করা হলেও পরে জানানো হয়, পোল্যান্ডের আকাশসীমা লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভেও নতুন হামলা হয়েছে। সেখানে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত পাঁচজন জরুরি সেবা কর্মী নিহত হয়েছেন। আরও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের সুমি অঞ্চলেও হামলায় একটি শিশুসহ তিনজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও ইউক্রেনের পাল্টা হামলার মুখে পড়েছে। মস্কোর দক্ষিণে অবস্থিত তুলা অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও তিনজন, যাদের মধ্যে এক বছরের একটি শিশুও রয়েছে।
যুদ্ধের কৌশলগত দিক থেকেও নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ক্রিমিয়াকে সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে রাতের আঁধারে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে হামলা চালানো হয়েছে। ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করার পর থেকে অঞ্চলটি কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে জেলেনস্কি যুদ্ধবিরতি নিয়ে সরাসরি আলোচনার জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স এই উদ্যোগকে সমর্থন করলেও ক্রেমলিন এখনো তাতে সাড়া দেয়নি।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, ট্রাম্পও পুতিনকে বলেছেন যে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি জরুরি এবং তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে প্রস্তুত।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে, যুদ্ধবিরতির আলোচনা যতই এগোক, রণক্ষেত্রে সংঘর্ষ থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ব্যস্ত থাকলেও ইউক্রেনের আকাশে এখনও প্রতিদিনই গর্জে উঠছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে শান্তির পথ এখনো দীর্ঘ ও অনিশ্চিত।

