মাসের পর মাস ধরে চলা সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধ এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি কাঠামোগত চুক্তি হয়েছে। এই ঘোষণার পরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় একই সময়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও জানান, দুই পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হবে।
যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে জানা গেছে এতে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। লেবাননও এই সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষ আলোচনার বড় বাধা হয়ে উঠেছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবালয় জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকে সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। একই সঙ্গে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালে আরও বিস্তৃত একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। সেখানে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎও আলোচনায় আসবে।
পারমাণবিক ইস্যুই এখন সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তবে বর্তমান সমঝোতায় সেই বিষয়টির চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। বরং পরবর্তী আলোচনার জন্য তা রেখে দেওয়া হয়েছে।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের বড় অংশ এই নৌপথ দিয়ে যায়। কয়েক মাস ধরে কার্যত বন্ধ থাকা এই রুটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গিয়েছিল। ট্রাম্প জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে হরমুজ প্রণালি আবার চালু হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধও প্রত্যাহার করা হবে।
এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। একই সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারেও উত্থান দেখা যায়। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
তবে সমালোচকরাও নীরব নন। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, যুদ্ধ থামানোর বিনিময়ে ওয়াশিংটন তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিশ্চিত সমাধান ছাড়া এই চুক্তি কতটা কার্যকর হবে।
এদিকে ইসরায়েল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। যদিও দেশটি শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অংশ ছিল না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মতবিরোধও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত করার মার্কিন চাপ নিয়ে দুই নেতার অবস্থানে পার্থক্য ছিল।
ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলোও সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান যদি যাচাইযোগ্যভাবে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়, তাহলে তারা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি বিবেচনা করবে।
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই সংঘাতে ইরান, লেবানন ও অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাই যুদ্ধবিরতির এই সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পারমাণবিক বিরোধের সমাধান এখনো পরবর্তী আলোচনার ওপরই নির্ভর করছে।

