যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে—এই ঘোষণাকে আপাতদৃষ্টিতে বড় কূটনৈতিক সাফল্য মনে হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১৪ অপরাহ্নে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই চুক্তি ট্রাম্পের জন্য এক ধরনের আনন্দের উপলক্ষ হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু প্রশ্ন, বহু শর্ত এবং ভেস্তে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি।
ট্রাম্প নিজেই সামাজিক মাধ্যমে চুক্তির কথা জানান। তাঁর দাবি, এই সমঝোতার মাধ্যমে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নৌ–অবরোধ তুলে নেবে। শুনতে বিষয়টি সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত জটিল একটি সমীকরণ। কারণ হরমুজ প্রণালি শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
রোববার চুক্তির ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে তিনি এমন এক চমৎকার সমঝোতা নিশ্চিত করেছেন, যা পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা আনতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাষণ ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক নতুন কিছু নয়। এর আগেও গাজা যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি নিয়ে তিনি অত্যন্ত বড় দাবি করেছিলেন। তখন তিনি সেটিকে স্থায়ী শান্তি এবং নতুন আশার যুগের সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতি দেখিয়েছে, বড় ঘোষণা আর মাঠের বাস্তবতা সবসময় এক নয়।
এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি নিয়েও সতর্ক থাকা জরুরি। যেকোনো বড় কূটনৈতিক সমঝোতার আসল শক্তি থাকে তার বিস্তারিত শর্ত, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর। কিন্তু এই চুক্তির ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অস্পষ্ট। চুক্তির কাঠামো নিয়ে বক্তব্য এসেছে, কিন্তু মূল শর্তগুলোর বাস্তব অর্থ কী, কোন পক্ষ কীভাবে তা ব্যাখ্যা করছে এবং কোন সময়সীমার মধ্যে কী বাস্তবায়ন হবে—এসব প্রশ্নের অনেক উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স রোববার ফক্স নিউজকে বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নজরদারি করতে পারবে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন তৈরি হয়। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের ওপর কী ধরনের সীমা থাকবে? ইরানের কাছে বর্তমানে যে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে, সেটির ভবিষ্যৎ কী হবে? তা ধ্বংস করা হবে, অন্য দেশে পাঠানো হবে, নাকি আন্তর্জাতিক তদারকির অধীনে রাখা হবে? এসব বিষয়ে স্পষ্টতা ছাড়া পারমাণবিক প্রশ্নে নিশ্চিত সাফল্যের দাবি করা কঠিন।
চুক্তির অনেক খুঁটিনাটি বিষয় অস্ত্রবিরতির বর্ধিত ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী আলোচনা ও কারিগরি পর্যায়ে সমাধান করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন যে সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে, সেটি শেষ কথা নয়; বরং আরও বড় আলোচনার দরজা খুলে দেওয়ার একটি প্রাথমিক ধাপ। তবে এখানেই ঝুঁকি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাস বহু দশকের। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে, চুক্তি হয়েছে, আবার ভেঙেও গেছে। ফলে ওয়াশিংটন যেটিকে নিশ্চয়তা ভাবছে, তেহরান সেটিকে হয়তো শর্তসাপেক্ষ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিবৃতিও এই অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট করে। সেখানে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে তখনই, যখন অন্য পক্ষ প্রাথমিক সমঝোতার অধীনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। এই বক্তব্যের অর্থ হলো ইরান এখনই সবকিছুতে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত নয়। তারা প্রথমে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রতিশ্রুতি রাখে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কীভাবে মাপা হবে, ইরান কোন পদক্ষেপকে যথেষ্ট মনে করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোন সীমা পর্যন্ত যেতে রাজি—এসব এখনো স্পষ্ট নয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও চুক্তির প্রভাব তাৎক্ষণিক হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। জ্বালানি বাজারের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেই তেল পরিবহন দ্রুত যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে—এমন ভাবার সুযোগ নেই। যুদ্ধের কারণে ট্যাঙ্কারের জট তৈরি হয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে, সমুদ্রপথে মাইন অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে এবং তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আবার নিয়মিত করতে সময় লাগবে। ফলে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব স্বাভাবিকতার মধ্যে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধান থাকতে পারে।
চুক্তি সইয়ের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চাইলে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি বিষয়গুলো মীমাংসা করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই সময়টিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার আগেই যদি কোনো পক্ষ নতুন শর্ত তোলে, কোনো সামরিক ঘটনা ঘটে, কিংবা আঞ্চলিক কোনো শক্তি পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়া ভেঙে পড়তে পারে। কূটনীতিতে শেষ মুহূর্ত অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন হয়।
এই সমীকরণে ইসরায়েল একটি বড় অনিশ্চিত শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধকে শুধু দুই দেশের সংঘাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাস্তবে এটি ছিল ত্রিমুখী উত্তেজনা, যেখানে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রোববার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। ট্রাম্পের মতে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু প্রায় চূড়ান্ত হওয়া ইরান চুক্তি নষ্ট করতে চেয়েছিলেন।
চুক্তি ঘোষণার সময় পর্যন্ত সমঝোতাটি টিকে ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে ইসরায়েল কী করবে? যদি ইসরায়েল আবার লেবাননে বড় সামরিক অভিযান শুরু করে, তাহলে ইরান সেটিকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে তেহরান আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমন কিছু ঘটলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে চাপের মুখে পড়বে।
জ্বালানি তেলের দাম যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। জে ডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ আমেরিকানদের জীবনে কষ্ট তৈরি করেছে। তিনি আমেরিকানদের ধৈর্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, এখন থেকে তেলের দাম কমতে শুরু করবে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কত দ্রুত ফল দেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী কংগ্রেসীয় নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। তেলের দাম যদি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমে, তাহলে ট্রাম্প ও তাঁর দলের জন্য এটি রাজনৈতিক স্বস্তি এনে দিতে পারে। কিন্তু দাম কমতে দেরি হলে, কিংবা চুক্তি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে, উল্টো চাপ আরও বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক জরিপও ট্রাম্পের জন্য খুব স্বস্তিদায়ক নয়। ইউগভের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ আমেরিকান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট। একই জরিপে ৫৭ শতাংশ মনে করেন, অর্থনীতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। তেলের দাম, বাজারের আস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়—সবকিছুই এখন রাজনৈতিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে চুক্তিটিকে একেবারে গুরুত্বহীন বলা যাবে না। যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি দূর না করলেও এই সমঝোতা তা কিছুটা কমাতে পারে। হরমুজ প্রণালি খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা, নৌ–অবরোধ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি এবং পারমাণবিক আলোচনার নতুন পথ—এসব মিলিয়ে এটি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু এটিকে স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা এখনই তাড়াহুড়ো হবে।
এই চুক্তির সামনে কয়েকটি বড় পরীক্ষা রয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে হবে তারা নৌ–অবরোধ প্রত্যাহার ও অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিক। দ্বিতীয়ত, ইরানকে দেখাতে হবে তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে পারমাণবিক আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতি চায়। তৃতীয়ত, ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ যেন পুরো প্রক্রিয়াকে নষ্ট না করে, সেটি নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। চতুর্থত, জ্বালানি বাজারে আস্থা ফেরাতে নিরাপদ সমুদ্রপথ, নিয়মিত সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা জরুরি।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি একই সঙ্গে আশার ও অনিশ্চয়তার গল্প। একদিকে এটি যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পথ দেখিয়েছে এবং জ্বালানি বাজারে স্বস্তির ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে পারমাণবিক ইস্যু, ইরানের শর্ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি, ইসরায়েলের ভূমিকা এবং অভ্যন্তরীণ মার্কিন রাজনীতি—সবকিছু মিলিয়ে চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
ট্রাম্পের জন্য এটি হয়তো রাজনৈতিকভাবে বড় ঘোষণা। কিন্তু ইতিহাস বলে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি শুধু ঘোষণায় আসে না; আসে বাস্তবায়নে, আস্থায় এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায়। তাই এই চুক্তি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলেও, এর সাফল্য নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিন, তারপর ৬০ দিনের আলোচনা এবং মাঠের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। শান্তির দরজা হয়তো খুলেছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো এখনো অনেক কঠিন পথ।

