দীর্ঘদিনের অতিনিম্ন সুদের নীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে এবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশটির অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় সুদের হার বাড়িয়ে গত ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ব্যাংক অব জাপান ঘোষণা দিয়েছে যে তাদের স্বল্পমেয়াদি নীতিগত সুদের হার ০ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। ১৯৯৫ সালের পর এই প্রথম জাপানে সুদের হার এমন উচ্চতায় পৌঁছাল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু জাপানের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বহু বছর ধরে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানই ছিল সবচেয়ে ব্যতিক্রমী, যেখানে প্রায় শূন্য সুদের হার বজায় রাখা হয়েছিল। এখন সেই নীতি থেকে সরে এসে দেশটি কঠোর মুদ্রানীতির পথে এগোচ্ছে।
ব্যাংক অব জাপানের এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম কারণ হলো সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা ও তেলের দামের উল্লম্ফনের ফলে জাপানের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত বেড়ে যায়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি উদ্যোগ পরিস্থিতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করেছে, তবুও জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
ব্যাংকটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাপানি অর্থনীতির ওপর যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা কমেছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করেছে। তবে একই সময়ে জ্বালানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ এখন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান দ্রুত ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও সতর্ক করেছে যে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়ছে। ফলে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই কারণেই আগেভাগে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংকের ভেতরেও ভিন্নমত দেখা গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেওয়া তৌইচিরো আসাদা সুদের হার বৃদ্ধির বিপক্ষে অবস্থান নেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির চেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা জাপানের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উৎপাদন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে বাজার বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। জাপানের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একজন বিশ্লেষক হিরোফুমি সুজুকি বলেন, বাজারে আশঙ্কা ছিল সুদের হার আরও বড় পরিসরে বাড়ানো হতে পারে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলনামূলক সংযত পদক্ষেপ নিয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা।
ঘোষণার পরই আর্থিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। জাপানের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক নিক্কেই ২২৫ এক শতাংশের বেশি বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্যও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। সরকারি বন্ডের ফলনও বেড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাপানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতির চাপ কমতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
সব মিলিয়ে, ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণের মাধ্যমে ব্যাংক অব জাপান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে জাপানের অর্থনীতিকে কতটা সহায়তা করবে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবণতার ওপর।

