বিশ্ব রাজনীতিতে বহু দশক ধরে একটি ধারণা প্রায় অটল সত্যের মতো টিকে ছিল—যে রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে, তাকে আক্রমণ করার আগে প্রতিপক্ষ বহুবার ভাববে। কারণ এমন আক্রমণ ভয়াবহ পাল্টা জবাব ডেকে আনতে পারে। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে এই ভয়ই এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করেছিল। সেই ভারসাম্যের নাম ছিল পারমাণবিক প্রতিরোধ। সহজ কথায়, নিজের ধ্বংসের ভয় দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ থেকে বিরত রাখা।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো এই পুরোনো ধারণাকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইউক্রেন, রাশিয়া, ইরান, ইসরায়েল, ভারত ও পাকিস্তানের ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে—পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই সব ধরনের আক্রমণ ঠেকানো যায় না। বরং ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার কৌশল এবং কম খরচের আধুনিক অস্ত্র যুদ্ধের নিয়ম বদলে দিচ্ছে। এখন ছোট রাষ্ট্র, এমনকি রাষ্ট্র নয় এমন সশস্ত্র গোষ্ঠীও বড় শক্তির দুর্বল জায়গায় আঘাত করার সক্ষমতা অর্জন করছে।
জুন ২০২৫ সালে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে যে সাহসী অভিযান চালায়, সেটি এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো রাশিয়ার ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন বিমানঘাঁটির কাছে পণ্যবাহী ট্রাকে স্বল্পপাল্লার আক্রমণকারী ড্রোন লুকিয়ে রাখে। এসব ঘাঁটির অনেকগুলোতেই রাশিয়ার কৌশলগত ভারী বোমারু বিমান ছিল, যেগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম। পরে রাশিয়ার নিজস্ব মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে দূর থেকে ড্রোনগুলো চালু করা হয়। ইউক্রেনের হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ১০টি বোমারু বিমান ধ্বংস হয় এবং মোট ৪১টি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে এমন কিছু বিমানও ছিল, যা পারমাণবিক কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
এই অভিযানের নাম ছিল মাকড়সার জাল অভিযান। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি শুধু সাহসী নয়, অত্যন্ত প্রতীকীও। কারণ রাশিয়া বহুদিন ধরে বলেছে, তার কৌশলগত সম্পদের ওপর প্রচলিত অস্ত্রের আঘাত পারমাণবিক জবাব ডেকে আনতে পারে। ২০২৪ সালেও মস্কো এই ধরনের বার্তা দিয়েছিল। অথচ বাস্তবে ইউক্রেন যখন রাশিয়ার এমন সংবেদনশীল সামরিক সম্পদে আঘাত করল, তখন রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেনি। এমনকি নতুন করে বড় ধরনের প্রকাশ্য পারমাণবিক হুমকিও দেয়নি। এর বদলে রাশিয়া কিয়েভে প্রচলিত আক্রমণ চালায়, যেখানে ৪০০টি ড্রোন ও ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
এখানেই পারমাণবিক প্রতিরোধের বর্তমান সংকট স্পষ্ট হয়। পারমাণবিক অস্ত্র পৃথিবীর সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র হলেও, তার ব্যবহার রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত কঠিন। কোনো নেতা জানেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি ইতিহাসে এক ভয়ংকর পরিচয় তৈরি করবে। ১৯৪৫ সালের পর থেকে এই অস্ত্র আর যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়নি। তাই পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয় সব পরিস্থিতিতে কার্যকর হচ্ছে না।
রাশিয়ার ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বিশাল পারমাণবিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনকে রাশিয়ার গভীরে আঘাত করা থেকে পুরোপুরি বিরত রাখা যায়নি। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর অনেকেই বলেছিলেন, ১৯৯৪ সালে ইউক্রেন সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, ইউক্রেনের হাতে যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, রাশিয়া হয়তো আক্রমণের সাহস করত না। কিন্তু চলমান বাস্তবতা অন্য প্রশ্নও তুলছে—পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই কি রাষ্ট্র সত্যিকারের নিরাপত্তা পায়? রাশিয়ার হাতে বিশাল পারমাণবিক ভাণ্ডার আছে, তবু তার কৌশলগত বিমানঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের ভাবনার জন্ম দেয়। ইসরায়েল তার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে না, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে বহুদিন ধরে বিশ্বাস করা হয় যে দেশটির হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে। তবু ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে হামাসের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ধারণাকে বড় ধাক্কা দেয়। এরপর ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও দেখিয়েছে—পারমাণবিক সক্ষমতার ধারণা প্রতিপক্ষকে সব সময় থামাতে পারে না।
ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরান ইসরায়েলের শহর, সামরিক স্থাপনা, এমনকি পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করেছে। মার্চে ইরান দিমোনায় ইসরায়েলের প্লুটোনিয়াম উৎপাদন চুল্লিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এ ঘটনা দেখায়, পারমাণবিক স্থাপনা শুধু প্রতিরোধের উৎস নয়; অনেক সময় তা নিজেই আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
ইসরায়েল এ বাস্তবতা মোকাবিলায় বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। স্বল্পপাল্লার আক্রমণ ঠেকাতে আয়রন ডোম, মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ডেভিডস স্লিং এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে অ্যারো ব্যবস্থার ওপর দেশটি নির্ভর করে। কিন্তু এখানেও বড় সমস্যা আছে। প্রতিপক্ষ যখন অল্প খরচে বহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, তখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খরচ বেড়ে যায়। অর্থাৎ সস্তা আক্রমণ ঠেকাতে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা চালু রাখতে হয়। এই অসম ব্যয়ের হিসাব আধুনিক যুদ্ধকে আরও কঠিন করে তুলছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগের যুগে পারমাণবিক প্রতিরোধের মূল ভিত্তি ছিল পাল্টা ধ্বংসের ভয়। এখন অনেক রাষ্ট্র বুঝতে পারছে, শুধু ভয় দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে থামানো যাবে না। বরং আক্রমণ ব্যর্থ করে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ প্রতিরক্ষা, স্থিতিস্থাপকতা, দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কও একই ধরনের বাস্তবতা দেখায়। দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্রধারী। তবু মে ২০২৫ সালে তারা এই শতকের সবচেয়ে গুরুতর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং একে অন্যের সীমান্তের গভীরে আক্রমণ চালায়। ২০২৫ সালের এই সংঘাত ১৯৯৯ সালের পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করে। পারমাণবিক অস্ত্র দুই দেশকে যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি বিরত রাখতে পারেনি। তবে পারমাণবিক ঝুঁকির ভয় বাইরের শক্তিগুলোকে দ্রুত মধ্যস্থতায় আগ্রহী করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আগেও কয়েকবার যুদ্ধবিরতিতে সহায়তা করেছে এবং ২০২৫ সালেও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। চীনও দাবি করেছে, গত বছর সংঘাত থামাতে তার ভূমিকা ছিল।
এ থেকে বোঝা যায়, পারমাণবিক অস্ত্রের ভূমিকা একরৈখিক নয়। কখনো তা সরাসরি যুদ্ধ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, আবার কখনো যুদ্ধ বড় আকার নেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে। কিন্তু এই আংশিক কার্যকারিতা পারমাণবিক অস্ত্রকে নিরাপত্তার নিখুঁত নিশ্চয়তা বানায় না।
শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন তিন ধরনের পারমাণবিক ব্যবস্থার ওপর ভরসা করত—ভূমিভিত্তিক আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, ডুবোজাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভারী বোমারু বিমান। এসব ব্যবস্থা ৩,৪০০ মাইলের বেশি দূরত্বে আঘাত করতে সক্ষম। এই ত্রিমুখী সক্ষমতার মূল উদ্দেশ্য ছিল, শত্রু প্রথমে আঘাত করলেও পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। ফলে কোনো পক্ষই প্রথম আঘাতের ঝুঁকি নিতে সাহস পায় না।
আজও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে এই ভয়ের ভারসাম্য কিছু ক্ষেত্রে কাজ করছে। উভয় পক্ষের হাতে আনুমানিক ৪,০০০টি করে পারমাণবিক অস্ত্র আছে। এই বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার সরাসরি সংঘাতকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো মিত্ররা ধীরে ধীরে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা বাড়িয়েছে, কিন্তু এমনভাবে করেছে যাতে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি না হয়। রাশিয়াও ন্যাটো ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত করা থেকে বিরত থেকেছে, যদিও ইউক্রেনের ভেতরে ঢোকার পর ন্যাটো সরবরাহকৃত অস্ত্রকে আক্রমণের লক্ষ্য করা হয়েছে।
তবে এই ভারসাম্য স্থায়ী থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। চীনের দ্রুত পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কৌশলগত চাপ তৈরি করছে। যদি একসময় যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের মতো দুই বৃহৎ পারমাণবিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হয়, তবে তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ তাই ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট তার দেশের পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার কথা বলেছেন। জার্মানির কয়েকজন রাজনীতিকও একই ধরনের আলোচনা তুলেছেন। পূর্ব এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার জনমতের বড় অংশ নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে ঝুঁকছে। এমনকি জাপানেও, যে দেশ একমাত্র পারমাণবিক হামলার শিকার হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনার আগ্রহ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আগ্রহ দেখাতে পারে, বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়লে।
কিন্তু আরও বেশি দেশে পারমাণবিক অস্ত্র ছড়িয়ে পড়া নিরাপত্তা বাড়াবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক সরলীকরণ। পারমাণবিক অস্ত্র রাশিয়ার কৌশলগত বোমারু বিমান রক্ষা করতে পারেনি। ইসরায়েলের শহরগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ভারত ও পাকিস্তানকে প্রচলিত সংঘাত থেকে পুরোপুরি বিরত রাখতে পারেনি। তাই নতুন রাষ্ট্রগুলো যদি ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র পেলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তবে তারা ভুল পথে হাঁটতে পারে।
পারমাণবিক বিস্তারের ঝুঁকি অত্যন্ত গভীর। ১৯৪৫ সালের পর থেকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নিষেধ-মানসিকতা টিকে আছে, কিন্তু এটি কোনো অবিনশ্বর দেয়াল নয়। ভুল হিসাব, প্রযুক্তিগত বিভ্রাট, অনুমোদনহীন ব্যবহার, ভুল সতর্ক সংকেত, কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর দ্রুত সিদ্ধান্ত—সবই ভবিষ্যতে দুর্ঘটনাজনিত উত্তেজনা বাড়াতে পারে। যত বেশি রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র যাবে, তত বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা তৈরি হবে। নতুন পারমাণবিক রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা কম থাকবে; অস্ত্রের নিরাপত্তা, সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে তারা ভুল করতে পারে।
আরও ভয়াবহ ঝুঁকি হলো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে পারমাণবিক উপাদান চলে যাওয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে নীতিনির্ধারকদের বড় ভয় ছিল, পারমাণবিক উপকরণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে। আজ যখন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তখন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও নতুন ধরনের হামলার ঝুঁকিতে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রগুলো কি আরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে, নাকি নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় বেশি বিনিয়োগ করবে? যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র, ডুবোজাহাজ ও বোমারু বিমান আধুনিকায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ দেখাচ্ছে, শুধু অস্ত্রভাণ্ডার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং বিমানঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, কমান্ড কেন্দ্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পারমাণবিক স্থাপনাকে কম খরচের দ্রুত আক্রমণ থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা বেশি প্রয়োজন।
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, কোনো দেশের নিজস্ব ভূখণ্ডও এখন পুরোপুরি নিরাপদ নয়। শত্রু যদি সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন ব্যবহার করে, তবে দূরের ঘাঁটিও আক্রান্ত হতে পারে। তাই পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলোর উচিত স্বল্প সতর্কবার্তায় কাজ করতে পারে এমন আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা। শুধু ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা নয়, সস্তা ও প্রচুর সংখ্যায় মোতায়েনযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দরকার। কারণ আধুনিক যুদ্ধে একসঙ্গে বহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আসতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে আন্তর্জাতিক নিয়ম শক্তিশালী করা। যুদ্ধের সময় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত না করার অঙ্গীকার জরুরি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বহুদিন ধরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা না করার আহ্বান জানাচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান ইতিমধ্যে একে অন্যের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা না করার বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ; প্রতি নববর্ষে তারা পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা বিনিময় করে। এই ধরনের নিয়ম বৈশ্বিক পর্যায়ে বিস্তৃত করা গেলে দুর্ঘটনাজনিত উত্তেজনা ও তেজস্ক্রিয় বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমতে পারে।
আজকের বাস্তবতা হলো, পারমাণবিক অস্ত্র এখনো পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি সর্বনাশা যুদ্ধ ঠেকাতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি প্রচলিত যুদ্ধ, ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ বা গোপন অভিযান ঠেকাতে ক্রমেই কম কার্যকর হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রগুলোর সামনে নতুন নিরাপত্তা চিন্তার দরজা খুলে গেছে।
এই নতুন যুগে শক্তির মানে শুধু বড় বোমা নয়। শক্তির মানে হলো দ্রুত আক্রমণ শনাক্ত করা, সস্তা ড্রোন ঠেকানো, গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রক্ষা করা, কমান্ড ব্যবস্থা সচল রাখা, জনগণকে নিরাপদ রাখা এবং যুদ্ধের মাঝেও রাজনৈতিক সংযম বজায় রাখা। যে রাষ্ট্র কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নিরাপত্তা খুঁজবে, সে আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা বুঝতে দেরি করবে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, পারমাণবিক অস্ত্র নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়; এটি এক ভয়ংকর ঝুঁকির ভারসাম্য। এই ভারসাম্য যত বেশি রাষ্ট্রের হাতে ছড়াবে, পৃথিবী তত বেশি অনিশ্চিত হবে। তাই সমাধান আরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র নয়। সমাধান হলো উন্নত প্রতিরক্ষা, শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতা, আন্তর্জাতিক নিয়ম, পারমাণবিক স্থাপনার সুরক্ষা এবং যুদ্ধের সময় সংযমের সংস্কৃতি।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের যুগে যুদ্ধ বদলে গেছে। এখন সেই বদলের সঙ্গে নিরাপত্তা চিন্তাকেও বদলাতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্র হয়তো এখনো পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকানোর শেষ ভয়ের প্রাচীর হিসেবে থাকবে, কিন্তু প্রচলিত আক্রমণ ঠেকাতে শুধু সেই প্রাচীরের ওপর নির্ভর করা বিপজ্জনক ভুল হতে পারে। পৃথিবী যদি বড় বিপর্যয় এড়াতে চায়, তবে তাকে পুরোনো পারমাণবিক ভয় নয়, নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে নিরাপত্তা গড়তে হবে।

