মাসের পর মাস ধরে চলা উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং অনিশ্চয়তার পর অবশেষে কূটনীতির পথে গুরুত্বপূর্ণ এক অগ্রগতি দেখা গেল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে এবং দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন।
বুধবার দুই দেশের শীর্ষ নেতার স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে আলোচিত এই সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতা শুধু যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগ নয়; বরং ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে, তারও একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করেছে।
সমঝোতা স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এতে তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে আনার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। বিনিময়ে দেশটির ওপর দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে অবস্থানকালে এই সমঝোতা স্মারকে সই করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে নৈশভোজের সময় ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষর সম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “এইমাত্র সই করলাম।”
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই জানিয়েছেন, দুই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এর বাস্তবায়ন।
এই সমঝোতার পেছনে রয়েছে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা দ্রুত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেয়। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলও কার্যত ব্যাহত হয়।
এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ শঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন চাপের মুখে ফেলে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার পথ তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা।
সমঝোতা স্মারকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। শর্ত অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইরানের তেল খাতকে কেন্দ্র করে আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা অর্জিত হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতায় গঠিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল বাস্তবায়নেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করবে।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকটি ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দুই পক্ষ সামরিক অভিযান স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে এবং স্থায়ী চুক্তির লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুরুতে এই নথিতে দুই দেশের প্রধান আলোচকদের স্বাক্ষরের পরিকল্পনা ছিল। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সরাসরি দুই রাষ্ট্রপ্রধানের স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। এর ফলে চুক্তিটির রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
যদিও এখনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিক লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি, তবে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই সঙ্গে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারক অবিলম্বে কার্যকর হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। কারণ অতীতেও বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা বাস্তবায়নের পথে রাজনৈতিক অবিশ্বাস, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তাজনিত জটিলতা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা উভয় পক্ষের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য।
এখন বিশ্বের নজর থাকবে পরবর্তী ধাপের দিকে—এই সমঝোতা কতটা বাস্তবায়িত হয়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া কতদূর এগোয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিই স্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়ে ওঠে কি না।

