যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার পর দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে থাকা এই সম্পর্ক এবার নতুন এক মোড়ে দাঁড়িয়েছে। এমন এক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, ইরানের জব্দ করা অর্থ শেষ পর্যন্ত ফেরত দিতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে।
বুধবার (১৭ জুন) ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে সেই অর্থ মূলত ইরানেরই সম্পদ এবং একসময় তা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
ট্রাম্পের ভাষায়, কোনো দেশের সম্পদ দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা হলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব পড়ে। তিনি মনে করেন, যদি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যে কোনো দেশের সম্পদ রাজনৈতিক কারণে স্থায়ীভাবে আটকে রাখা হতে পারে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ডলারের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা অর্থ আসলে ইরানের। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সেই অর্থ জব্দ করা হয়েছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অর্থ ফেরতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতে পারে।
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সমঝোতার আওতায় বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক আয়োজন শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আঞ্চলিক অংশীদারদের সহযোগিতায় ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এই অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র দেবে না বলে স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত মেনে চলে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগের পথ আরও উন্মুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সহায়তা ও বিনিয়োগ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে ইরানের ভবিষ্যৎ আচরণ ও নীতিগত অবস্থানের ওপর।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, দীর্ঘদিনের সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার কারণে ইরানের অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। তার মতে, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হলে ইরানকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে হবে।
এদিকে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রশ্নে ট্রাম্প সরাসরি কোনো সময়সীমা উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরান ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলে ওয়াশিংটনের অবস্থানও নমনীয় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আরোপিত প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু অর্থ ফেরতের প্রশ্ন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন বাস্তবতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে দুই দেশ সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে ছিল, সেখানে এখন অর্থ ফেরত, বিনিয়োগ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো বিষয় আলোচনায় উঠে আসছে। তবে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসে দুই পক্ষের পদক্ষেপ এবং চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়নের ওপর।

