মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক কার্যকর হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এই সমঝোতা নতুন করে শান্তির আশা তৈরি করলেও একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। কারণ সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।
ফ্রান্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি সমঝোতার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হামলা চালানো হতে পারে। যদিও তিনি একইসঙ্গে দাবি করেন, তার লক্ষ্য নতুন যুদ্ধ শুরু করা নয়। বরং তিনি চান ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চলুক এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি না হোক। তার ভাষায়, শান্তির সুযোগ এখন ইরানের সামনে রয়েছে, তবে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্পূর্ণভাবে তেহরানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এই সমঝোতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনের একটি পথ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে উভয় দেশের আলোচক দল আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করছে। ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিও এর ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে এবং তেলের দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সমঝোতা স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে আনবে। এর বিনিময়ে দেশটি বড় আকারের অর্থনৈতিক সুবিধা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ পেতে পারে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখার বিষয়টিও এই সমঝোতার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় এই জলপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল।
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে অবস্থানকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প সমঝোতা স্মারকে সই করেন। একই সময়ে এতে স্বাক্ষর করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই জানিয়েছেন, স্মারকটি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এটি ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে।
শুরুতে পরিকল্পনা ছিল যে ইরানের প্রধান আলোচক ও স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকে সই করবেন। তবে পরে তেহরান জানিয়ে দেয়, সরাসরি উপস্থিতিতে স্বাক্ষরের আর প্রয়োজন নেই। ফলে দুই দেশের শীর্ষ নেতার অনুমোদনের মাধ্যমেই চুক্তিটি কার্যকর করা হয়।
এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে বাস্তবায়ন শুরু হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, এটিকে এখনই স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা বলা যাবে না। কারণ চুক্তি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ওয়াশিংটন এখনো ইরানের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে তেহরানও অর্থনৈতিক স্বস্তি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
ফলে আগামী ৬০ দিনই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যেই বোঝা যাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই নতুন সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে কিনা, নাকি এটি কেবল আরেকটি সাময়িক বিরতি হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।

