ফ্রান্সে ১৫ থেকে ১৭ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছে জি-৭-এর ৫২তম শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের প্রভাবশালী শিল্পোন্নত দেশগুলোর এই জোটে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান। ভারত এই জোটের আনুষ্ঠানিক সদস্য নয়। তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জি-৭-এর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতে ভারতকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। ২০২৬ সালের সম্মেলনেও ফ্রান্সে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
প্রশ্ন উঠছে, সদস্য না হয়েও ভারত কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে? কেন জি-৭-এর মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মঞ্চে ভারতকে বারবার ডাকা হচ্ছে? এর উত্তর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে আছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, ভূরাজনীতি, জলবায়ু, প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার মতো বড় বিষয়।
এই নিয়ে মোট ১৩ বার জি-৭ বৈঠকে আমন্ত্রণ পেয়েছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টানা সাতবার এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। এর আগেও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ২০০৩ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে একাধিকবার জি-৭ এবং সম্প্রসারিত জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ ভারতের উপস্থিতি কোনো একক সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা।
জি-৭ গঠিত হয়েছিল মূলত উন্নত শিল্পোন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর আলোচনার মঞ্চ হিসেবে। ১৯৭৩ সালে প্যারিসে এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় এবং প্রথম বৈঠক হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথম বৈঠকে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স ও জাপান অংশ নেয়। পরের বছর কানাডা যোগ দেয়। ১৯৭৭ সালের বৈঠক থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও অংশ নিতে শুরু করে, যদিও সেটি আলাদা করে জি-৭-এর সদস্য নয়।
তবে সময় বদলেছে। এখন বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত শুধু পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য বদলেছে, জনসংখ্যার কেন্দ্র বদলেছে, বাজারের শক্তি বদলেছে, প্রযুক্তির বিস্তার বদলেছে। এই নতুন বাস্তবতায় ভারতকে বাদ দিয়ে বড় কোনো বৈশ্বিক আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না।
ভারতের গুরুত্বের প্রথম বড় কারণ হলো উন্নয়নশীল বিশ্বের কণ্ঠস্বর হিসেবে তার অবস্থান। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে এসেছে যে বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে তাদের প্রয়োজন ও উদ্বেগ যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। জলবায়ু অর্থায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, ঋণ সংকট, প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার কিংবা জ্বালানি রূপান্তর—এসব প্রশ্নে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থান অনেক সময় উন্নত বিশ্বের অগ্রাধিকারের সঙ্গে মেলে না।
এই জায়গায় ভারত নিজেকে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে তুলে ধরেছে। ভারত একদিকে বড় অর্থনীতি, অন্যদিকে এখনো উন্নয়নশীল দেশের বহু বাস্তবতা বহন করে। ফলে জি-৭-এর জন্য ভারত এমন এক অংশীদার, যে পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিকে দক্ষিণ বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সাহায্য করতে পারে।
দ্বিতীয় বড় কারণ ভারতের অর্থনীতি। ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম বড় ভোক্তা বাজার। তার মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত বাড়ছে, উৎপাদন খাত বিস্তৃত হচ্ছে, প্রযুক্তি সেবা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে এবং ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। যে কোনো বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা উন্নত অর্থনীতির জন্য ভারত এখন শুধু বাজার নয়; বরং বিনিয়োগ, উৎপাদন, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র।
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থার নতুন পথ খুঁজছে। অতিরিক্তভাবে এক বা দুই দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রবণতা বেড়েছে। এই বাস্তবতায় ভারতকে একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন ঘাঁটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। জি-৭ দেশগুলো বুঝতে পারছে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে ভারতের ভূমিকা দিন দিন বাড়বে।
তৃতীয় কারণ হলো চীনের প্রভাব মোকাবিলা। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব দ্রুত বেড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে এটি এখন বড় কৌশলগত উদ্বেগ। চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার প্রভাব জি-৭ দেশগুলোর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। তাই ভারতকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভারসাম্যের একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চতুর্থ কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে ভারতকে পাশে পাওয়া ছাড়া বাস্তব অগ্রগতি কঠিন। ভারত বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। ফলে তার জ্বালানি ব্যবহার, কয়লার ওপর নির্ভরতা, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং শিল্পায়নের পথ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বড় প্রভাব ফেলে।
একই সঙ্গে ভারত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তি নিয়ে বড় উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সৌর জোটের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত নিজেকে জলবায়ু আলোচনায় কেবল দাবিদার নয়, সমাধানদাতা হিসেবেও তুলে ধরছে। জি-৭ দেশগুলো জানে, জলবায়ু চুক্তি কাগজে সফল হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে কার্যকর করতে হলে ভারতের মতো দেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ দরকার।
পঞ্চম কারণ ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। ভারত নিজেকে কোনো একক শক্তি বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কিংবা বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকট—এসব বিষয়ে ভারত প্রথাগত মিত্রতার বাইরে গিয়ে নিজস্ব অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। কখনো পশ্চিমের সঙ্গে কাজ করেছে, কখনো রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, আবার একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বক্তব্যও সামনে এনেছে।
এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অনেক সময় পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য অস্বস্তিকর হলেও কূটনৈতিকভাবে মূল্যবান। কারণ ভারত এমন কিছু দেশের সঙ্গে কথা বলতে পারে, যাদের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সরাসরি সম্পর্ক জটিল। তাই বৈশ্বিক সংকটের সময় ভারত একটি সংযোগকারী শক্তি হিসেবেও গুরুত্ব পায়।
ভারতের আরেকটি বড় শক্তি হলো গণতান্ত্রিক পরিচয়। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতকে পশ্চিমা দেশগুলো অনেক সময় আদর্শিকভাবে কাছের অংশীদার হিসেবে তুলে ধরে। যদিও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও গণতন্ত্রের মান নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক আছে, তবু জি-৭ মঞ্চে ভারতকে গণতান্ত্রিক বিশ্বের একটি বড় শক্তি হিসেবে দেখা হয়।
তবে ভারতের জি-৭ উপস্থিতি এখন আর শুধু আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী নয়। ডিজিটাল অবকাঠামো, খাদ্য নিরাপত্তা, উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের অগ্রাধিকার—এসব প্রশ্নে ভারত এখন আলোচনার সক্রিয় অংশীদার। জি-৭ দেশগুলো শুধু ভারতের মতামত শুনছে না; অনেক ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা ছাড়া তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিবর্তন বিশ্বরাজনীতির বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। এক সময় বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্র ছিল মূলত পশ্চিমা শক্তিগুলোর হাতে। এখন সেই কাঠামো বদলাচ্ছে। ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরবের মতো উদীয়মান শক্তিগুলো বিশ্বনীতির আলোচনায় আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট, কারণ দেশটি একই সঙ্গে বড় বাজার, বড় জনসংখ্যা, প্রযুক্তি শক্তি, সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব—সবকিছু মিলিয়ে এক বিশেষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
তবে এই গুরুত্বের সঙ্গে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। জি-৭ মঞ্চে বারবার আমন্ত্রণ পাওয়া মানে বড় শক্তিগুলোর প্রত্যাশাও বাড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলো চায় ভারত চীনের প্রভাব মোকাবিলায় আরও সক্রিয় হোক, রাশিয়ার বিষয়ে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিক, জলবায়ু লক্ষ্য পূরণে বড় প্রতিশ্রুতি দিক এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা নিক। অন্যদিকে ভারত নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে চায়।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই ভারতের কূটনীতির মূল চ্যালেঞ্জ। একদিকে জি-৭-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে স্বাধীন অবস্থান; একদিকে পশ্চিমা বিনিয়োগের প্রয়োজন, অন্যদিকে রাশিয়া ও দক্ষিণ বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক; একদিকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে উন্নয়নের জ্বালানি প্রয়োজন—সব মিলিয়ে ভারতকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
তবু একটি বিষয় পরিষ্কার, ভারত এখন শুধু আমন্ত্রিত অতিথি নয়। বরং বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের টেবিলে ক্রমশ প্রয়োজনীয় অংশীদার হয়ে উঠছে। জি-৭ সদস্য না হয়েও ভারতের উপস্থিতি তাই ব্যতিক্রম নয়; বরং বর্তমান বিশ্বরাজনীতির বাস্তব প্রতিফলন।
শেষ পর্যন্ত জি-৭ মঞ্চে ভারতের বারবার ডাক পাওয়া একটি বড় বার্তা দেয়—বিশ্বশক্তির হিসাব বদলে গেছে। শুধু পুরোনো শিল্পোন্নত শক্তিগুলো নয়, উদীয়মান অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিরাও এখন বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে অপরিহার্য। আর সেই নতুন বাস্তবতায় ভারত এমন এক শক্তি, যাকে উপেক্ষা করা জি-৭-এর পক্ষেও আর সম্ভব নয়।

