রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন এক তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউক্রেনের ড্রোন এবার আবারও আঘাত করেছে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে। বৃহস্পতিবার মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ঘনবসতিপূর্ণ কাপোতনিয়া এলাকায় অবস্থিত ওই শোধনাগারে হামলার পর আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখা যায়। রুশ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল মস্কোর ওপর এ বছরের অন্যতম বড় ড্রোন হামলা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। তবে কয়েকটি ড্রোন মস্কোর তেল শোধনাগার পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়। তিনি আরও জানান, হামলায় একটি বিপণিবিতানেও সামান্য ক্ষতি হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, সারা দেশে মোট ৫৫৫টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। মস্কো অঞ্চলের আশপাশেই ১৮০টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে বলে মেয়র সোবিয়ানিন জানিয়েছেন। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের ভাষ্য অনুযায়ী, মস্কোর ওপর এই হামলা চলতি বছরের সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি।
এই হামলা শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি যুদ্ধের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ইউক্রেন দেখাতে চাইছে যে তারা এখন রাশিয়ার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নিয়মিতভাবে আঘাত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার জন্য এটি প্রমাণ করছে যে যুদ্ধক্ষেত্র এখন শুধু ইউক্রেনের সীমান্ত বা দখল করা অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই; রাশিয়ার রাজধানীও সরাসরি চাপের মুখে পড়ছে।
মস্কোর যে শোধনাগারে হামলা হয়েছে, সেটি রাজধানীর জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর আগে মঙ্গলবারও একই শোধনাগারে ড্রোন হামলা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ওই হামলার পর শোধনাগারটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক দিনের ব্যবধানে একই স্থাপনায় দ্বিতীয় হামলা রাশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রাশিয়া বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও জ্বালানি রপ্তানিকারক বড় শক্তি। কিন্তু ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলার কারণে দেশটির বিভিন্ন শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জ্বালানি ঘাটতির আশঙ্কায় রাশিয়া চলতি মাসে সমুদ্রপথে পেট্রোল আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যে দেশ নিজেই বিশাল জ্বালানি রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই দেশকে এখন অভ্যন্তরীণ ঘাটতি সামলাতে আমদানির দিকে তাকাতে হচ্ছে—এটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপের একটি বড় ইঙ্গিত।
মস্কো অঞ্চলের গভর্নর জানিয়েছেন, হামলায় একটি উঁচু আবাসিক ভবন, একটি শিল্প স্থাপনা এবং কয়েকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর মস্কোর সব বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। রাজধানীর চারপাশের মহাসড়কের একটি অংশও বন্ধ করে দেওয়া হয়। মস্কোর সবচেয়ে ব্যস্ত শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দর খালি করে দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
রাশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলও একই সময়ে হামলার মুখে পড়ে। বেলগোরোদ সীমান্ত অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় গাড়িতে থাকা এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলেও ড্রোন হামলায় একজন নিহত হন এবং দুটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় আগুন লাগে।
ইউক্রেনের দৃষ্টিতে এসব হামলা রাশিয়ার আগ্রাসনের জবাব। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মস্কোর বাসিন্দাদের উদ্দেশে লিখেছেন, অনেক মস্কোবাসী সকালে জানতে চাইছেন কী হচ্ছে। এর উত্তর হলো, তাদের দেশ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের যুদ্ধ শুরু করেছে এবং বছরের পর বছর ধরে ইউক্রেনের মানুষকে হত্যা করছে। এখন তারা যদি বুঝতে চান কী হচ্ছে, তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জিজ্ঞেস করা উচিত তিনি কখন এই যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনা করছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও রাশিয়ার ওপর হামলাগুলোকে রুশ হামলার ন্যায্য জবাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ইউক্রেনের শহর ও জনগোষ্ঠীর ওপর রাশিয়ার হামলার জবাবে এটি সম্পূর্ণ ন্যায্য প্রতিক্রিয়া এবং রুশ যুদ্ধযন্ত্রকে সহায়তা করা স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় সেনাদের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল।
তবে যুদ্ধের এই পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে ইউক্রেনও রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে কিয়েভে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ইউক্রেনের বেশির ভাগ অঞ্চলে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো টেলিগ্রামে জানান, শত্রুপক্ষ রাজধানীতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালাচ্ছে। তিনি নাগরিকদের সতর্কতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে থাকার আহ্বান জানান।
ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি শহরের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। এর আগে চলতি সপ্তাহেই রাশিয়ার বড় হামলায় কিয়েভের একটি ঐতিহাসিক মধ্যযুগীয় মঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ইউক্রেনের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ওই হামলার পর ইউরোপীয় নেতারা নিন্দা জানান। তবে রাশিয়া ওই স্থাপনায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুদ্ধের চার বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পর দুই পক্ষই এখন নতুন ধরনের চাপ তৈরির কৌশল নিচ্ছে। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোয় ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। অন্যদিকে ইউক্রেন এখন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়াচ্ছে।
ইউক্রেনের দাবি, তাদের ড্রোন সক্ষমতার উন্নতি যুদ্ধের গতিপথে পরিবর্তন আনছে। কিয়েভ বলছে, মধ্যপাল্লার ড্রোন দিয়ে রুশ সরবরাহ লাইন ব্যাহত করা হচ্ছে এবং দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ইউক্রেনের মতে, এই চাপই মস্কোকে শান্তি আলোচনায় বাধ্য করতে পারে।
অন্যদিকে মস্কো দাবি করছে, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাশিয়া শান্তি আলোচনার আগে ইউক্রেনকে আরও ভূখণ্ড ছাড়ার শর্ত দিয়েছে। কিন্তু ইউক্রেন বলছে, ২০২৩ সালের পর প্রথমবারের মতো তারা কিছু এলাকায় অগ্রগতি অর্জন করছে এবং রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সে অবস্থানকালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। জেলেনস্কি এখন কূটনৈতিকভাবে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন, যাতে মস্কো যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় আসতে বাধ্য হয়। ট্রাম্পও বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের তুলনায় বেশি সেনা হারাচ্ছে।
সব মিলিয়ে মস্কোর তেল শোধনাগারে এই হামলা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি শুধু আগুন, ধোঁয়া বা অবকাঠামোগত ক্ষতির ঘটনা নয়; বরং রাশিয়ার গভীরে ইউক্রেনের আঘাত করার সক্ষমতার প্রকাশ। একই সঙ্গে এটি দেখাচ্ছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই দুই পক্ষের কৌশল আরও বিস্তৃত, ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, জ্বালানি অবকাঠামোতে বারবার হামলা দেশের অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ এবং জনমনে চাপ তৈরি করতে পারে। ইউক্রেনের জন্য বড় প্রশ্ন হলো, এসব হামলা সত্যিই কি রাশিয়াকে আলোচনায় আনতে পারবে, নাকি আরও কঠোর পাল্টা হামলার পথ খুলে দেবে।
এই যুদ্ধ এখন শুধু সামনের সারির সেনা অবস্থানের লড়াই নয়; এটি জ্বালানি, আকাশ প্রতিরক্ষা, কূটনীতি এবং মানসিক চাপের যুদ্ধেও পরিণত হয়েছে। মস্কোর আকাশে উঠা ধোঁয়া সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই শক্তিশালী ইঙ্গিত।

