দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে—তুরস্ক কি ধীরে ধীরে পশ্চিমা জোট থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিলেই বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, আঙ্কারা হয়তো তার ঐতিহাসিক পশ্চিমমুখী অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির চাপের কারণে তুরস্ক এখন আবারও পশ্চিমা জোটের দিকে ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে অনেকে রাশিয়ার প্রভাব হ্রাস এবং ন্যাটোর কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।
তুরস্কের পশ্চিমা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ নতুন নয়। দুই হাজার তিন সালে ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনীকে তুর্কি ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই বিতর্কের শুরু করে। এরপর দুই হাজার দশ সালে ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ভোট এবং দুই হাজার সতেরো সালে রাশিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার ঘটনা এই সন্দেহকে আরও গভীর করে।
এসব ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে তুরস্ক ধীরে ধীরে পশ্চিমা জোট থেকে দূরে সরে গিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে।
তুরস্ক ও রাশিয়ার সম্পর্কের এই পরিবর্তন হঠাৎ হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সিরিয়া সংকট, নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা এবং ন্যাটোর প্রতি আস্থার সংকট।
দুই হাজার পনেরো সালে সিরিয়া সীমান্তে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভয়াবহভাবে খারাপ হয়ে যায়। এরপর রাশিয়ার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কা আঙ্কারাকে নতুন কৌশল নিতে বাধ্য করে।
পরবর্তী সময়ে দুই হাজার ষোল সালের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময় রাশিয়ার দ্রুত সমর্থন এর্দোয়ানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও প্রভাবিত করে। একই সময়ে ন্যাটোর তুলনামূলক ধীর প্রতিক্রিয়া আঙ্কারার আস্থাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায় এবং পরে রাশিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়।
দুই হাজার বাইশ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে তুরস্ক এক জটিল অবস্থানে পড়ে যায়। একদিকে আঙ্কারা রাশিয়ার আগ্রাসনের সমালোচনা করে, ইউক্রেনকে ড্রোন ও সামরিক সহায়তা দেয় এবং জাতিসংঘের রাশিয়া-বিরোধী প্রস্তাবকে সমর্থন করে। অন্যদিকে তারা রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয় না।
এই দ্বিমুখী অবস্থান তুরস্ককে এক ধরনের “ভারসাম্য কূটনীতি”র মধ্যে রাখে। রাশিয়ার জন্য তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি অংশীদারে পরিণত হয়।
রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করে।
দুই হাজার তেইশ সালের নির্বাচনের সময় তুরস্কের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত চাপে ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং আর্থিক ভারসাম্যহীনতা সরকারকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছিল তুরস্কের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, ফলে ইউরোপ থেকে দূরে সরে থাকা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই ছিল না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ক্ষতি করে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন করে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা শুরু করে।
নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে তুরস্ক ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন শুরু করে। সুইডেনের ন্যাটো সদস্যপদ নিয়ে আগের বিরোধ প্রত্যাহার করা হয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে জ্বালানি আমদানির উৎসও পরিবর্তন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইরাক এবং অন্যান্য দেশ থেকে তরল গ্যাস আমদানি বাড়ানো হয়। পাশাপাশি কিছু রাশিয়ান প্রকল্প ধীরে ধীরে স্থগিত বা সীমিত করা হয়।
তুরস্কের জ্বালানি খাতে রাশিয়ার ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই নির্ভরতা কমানোর স্পষ্ট উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি কমে আসছে এবং নতুন পারমাণবিক প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ছে। এটি তুরস্কের কৌশলগত বহুমুখীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ন্যাটোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক পুনরায় শক্তিশালী হওয়া। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ন্যাটো তুরস্কের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা করছে।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিমান প্রতিরক্ষা এবং সামরিক আধুনিকীকরণে নতুন সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। স্থগিত কিছু প্রতিরক্ষা প্রকল্পও আবার সক্রিয় হয়েছে।
তুরস্কের এই পরিবর্তন মস্কোর জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ কমে এসেছে এবং আঞ্চলিক ইস্যুতে মতবিরোধ বেড়েছে।
বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যুতে তুরস্কের অবস্থান রাশিয়ার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, তুরস্ক পুরোপুরি একপক্ষীয় অবস্থান নেয়নি। দেশটি এখনো কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি অনুসরণ করছে, যার অর্থ হলো বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা।
তবে বাস্তবতা হলো, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার কারণে পশ্চিমা জোটই এখন তুরস্কের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে।
তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি কোনো আকস্মিক পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। রাশিয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বাস্তবতা দেশটিকে আবারও পশ্চিমা জোটের দিকে ফিরিয়ে আনছে।
তবে এটি সম্পূর্ণ দিক পরিবর্তন নয়; বরং একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের রাজনীতি, যেখানে তুরস্ক একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।
শেষ পর্যন্ত এটি শুধু তুরস্কের গল্প নয়—বরং আধুনিক ভূরাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য ছোট ও মাঝারি শক্তির বাস্তববাদী কৌশলের একটি বড় উদাহরণ।

