মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মোড় আসার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তির আভাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার খবর এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে টানা অনিশ্চয়তার পর আবারও নিম্নমুখী হয়েছে তেলের মূল্য।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল এই পথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে পৌঁছে থাকে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই পথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫৪ সেন্ট বা ০.৬৮ শতাংশ কমে ৭৮.৩১ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দাম ৪৬ সেন্ট বা ০.৬০ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৬.১৪ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নির্ধারণে সরবরাহ পরিস্থিতি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক হলে বাজারে তেলের প্রবাহ বাড়বে। ফলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কমে যাবে এবং দামের ওপর চাপও হ্রাস পাবে। বর্তমানে বাজারে যে দরপতন দেখা যাচ্ছে, তা মূলত ভবিষ্যৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক প্রত্যাশার প্রতিফলন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বাজারে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছিল। সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি মাথায় রেখে অনেক ক্রেতা ও ব্যবসায়ী আগাম মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। ফলে অতিরিক্ত চাহিদার চাপ কমে এসেছে এবং দামও নিম্নমুখী হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি বৈঠকে না বসে ডিজিটাল পদ্ধতিতে একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মতি জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। এই সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার পাশাপাশি ইরানের ওপর আরোপিত কিছু আর্থিক বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য কমার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ে। ফলে তেলের দাম কমে আসা অনেক দেশের জন্য ইতিবাচক অর্থনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। তাই বর্তমান দরপতন অব্যাহত থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর। তবুও আপাতত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তির আবহ ফিরে এসেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

