মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং দীর্ঘ সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিয়েছে ইরান। আগামী ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরনের ফি বা টোল আদায় করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাতে প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ইরান বলছে, সাম্প্রতিক ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আওতায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যকে স্বাভাবিক করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে। ফলে এখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুই মাস হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে আগ্রহী জাহাজগুলোকে কোনো অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। একইসঙ্গে পারস্য উপসাগর জলপথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সব আবেদন নিষ্পত্তি করে। এর ফলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাত কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে টোল মওকুফ করা হলেও পুরোপুরি অবাধ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ইরান জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে জাহাজগুলোকে নির্ধারিত রুট ও সময়সূচি অনুসরণ করেই চলাচল করতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে জলপথের কিছু অংশ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তেহরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে চাইছে। একইসঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রেও নিজেদের দায়িত্বশীল ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কারিগরি নির্দেশনা ও পরিচালনাগত তথ্য খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। এছাড়া সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জলপথে থাকা মাইন অপসারণসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনরুদ্ধার হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দামের ওপর চাপ কমতে পারে। কারণ গত কয়েক মাসে এই জলপথকে ঘিরে অনিশ্চয়তা জ্বালানি বাজারে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।
সব মিলিয়ে ৬০ দিনের জন্য টোলমুক্ত চলাচলের ঘোষণা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হয় এবং হরমুজ প্রণালি আবারও আগের মতো বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও ব্যস্ত নৌপথে পরিণত হতে পারে কি না।

