১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর যখন রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন হঠাৎ পদত্যাগ করে ভাঙাচোরা শাসনভার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে তুলে দেন, তখন বিশ্ব রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক অচেনা মুখ। দীর্ঘ ২৭ বছর পর আজ সব সমীকরণ বদলে গেছে। আয়তনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই দেশটিকে পুতিন এখন নিজের হাতের তালুর মতো চেনেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিজনেস মাফিয়াদের প্রভাব, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, দুর্বল সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদের চাপে টালমাটাল রাশিয়াকে ভ্লাদিমির পুতিন এমন একটি ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে গেছেন, যেখানে তাকে ক্ষমতাচ্যুত বা স্পর্শ করা যেকোনো শক্তির জন্যই অসম্ভব এক সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, কীভাবে পুতিন এত দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় টিকে আছেন এবং কেন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হচ্ছে না?
পুতিনের দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করেনি। বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক শক্তি, বিশ্বস্ত ক্ষমতাকেন্দ্র, সামরিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক কৌশলের সমন্বয়ে তিনি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যা তার ক্ষমতার ভিত্তিকে অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে।
নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বলয়ের শক্তি
পুতিনের ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো রাশিয়ার গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা যন্ত্রের উপর তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতায় আসার পর তিনি দ্রুত নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন করেন এবং একাধিক সংস্থার মাধ্যমে এমন একটি বহুমাত্রিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যেখানে রাষ্ট্রের ভেতরে কিংবা বাইরে তার বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্র দ্রুত শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এফএসবি, বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতার জন্য এসভিআর, সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য জিআরইউ, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এফএসও এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দমনের জন্য ন্যাশনাল গার্ড—সব মিলিয়ে একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে। এর ফলে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক বিদ্রোহ কিংবা সাংগঠনিক ষড়যন্ত্র গোপন রাখা অত্যন্ত কঠিন।
শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর উপর নির্ভর করেই পুতিন ক্ষমতা ধরে রাখেননি। তিনি অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছেন। ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ার তেল, গ্যাস, ব্যাংকিং ও খনিজ সম্পদের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন প্রভাবশালী অলিগার্করা। তাদের অনেকেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তার করতেন। ক্ষমতায় এসে পুতিন স্পষ্ট করে দেন যে— “ব্যবসা করা যাবে, সম্পদ অর্জন করা যাবে, কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।” যারা এই সীমা অতিক্রম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকি, দুর্নীতি বা অন্যান্য অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেকেই কারাগারে গেছেন, কেউ দেশ ছেড়েছেন, আবার কারও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর ফলে অর্থনৈতিক শক্তি ধীরে ধীরে ক্রেমলিনের অধীনে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
সিলোভিকি নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমান্তরালভাবে গড়ে ওঠে তথাকথিত ‘সিলোভিকি’ নেটওয়ার্ক। সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সদস্য এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এই বলয় আজ রাশিয়ার প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের রাজনৈতিক ও আর্থিক ভবিষ্যৎ সরাসরি পুতিনের ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে পুতিনের পতন মানে কেবল একজন নেতার পতন নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ ক্ষমতা কাঠামোর পতন। এই বাস্তবতা তাদেরকে পুতিনের প্রতি আরও বেশি অনুগত করে তুলেছে।
পুতিনের আরেকটি বড় সাফল্য হলো আঞ্চলিক প্রশাসনের উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। একসময় রাশিয়ার গভর্নররা সরাসরি নির্বাচিত হতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যাতে আঞ্চলিক নেতৃত্বের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ক্রেমলিনের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে রাশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামো কার্যত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি অনুগত থাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পদ ও রাজস্ব ব্যবস্থাও এমনভাবে পরিচালিত হয় যে স্থানীয় প্রশাসন কেন্দ্রের সহযোগিতা ছাড়া কার্যকরভাবে চলতে পারে না।
ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভীতি ও প্রতিরোধমূলক বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গত দুই দশকে পুতিনবিরোধী বিভিন্ন ব্যক্তি, সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর রহস্যজনক মৃত্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, এগুলো ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে কাজ করেছে। ফলে রাশিয়ার রাজনৈতিক অভিজাতদের বড় অংশ প্রকাশ্যে পুতিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সতর্ক থাকে।
সংকট মোকাবিলা ও সামরিক শক্তির প্রভাব
তবে পুতিনের ক্ষমতা শুধু ভয় বা নিয়ন্ত্রণের উপর দাঁড়িয়ে নেই। তিনি নিজেকে বহু সংকটের সময় রাশিয়ার স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধ, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ এবং ২০২৩ সালে ওয়াগনার গ্রুপের বিদ্রোহ মোকাবিলার মতো ঘটনাগুলো তার সমর্থকদের কাছে তাকে একজন দৃঢ় ও কার্যকর নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষ করে ওয়াগনার প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোঝিন-এর বিদ্রোহ ছিল পুতিনের ক্ষমতার জন্য অন্যতম বড় পরীক্ষা। কিন্তু সেই সংকটও শেষ পর্যন্ত তার শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পুতিনের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী রাশিয়া। স্থল, জল ও আকাশভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা দেশটিকে একটি বিশেষ কৌশলগত অবস্থান দিয়েছে। এই বাস্তবতা পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য সরাসরি সামরিক সংঘর্ষকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও তা প্রায়ই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে।
অর্থনীতি, বিকল্প বাণিজ্য ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েও রাশিয়ার অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। এর পেছনে পুতিনের অর্থনৈতিক অভিযোজন কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইউরোপীয় বাজার সংকুচিত হওয়ার পর রাশিয়া দ্রুত এশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। চীন এবং ইন্ডিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিকল্প বাজার তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে সামরিক শিল্পকে কেন্দ্র করে এক ধরনের যুদ্ধ অর্থনীতি গড়ে ওঠে, যা বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবুও স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে।
পুতিনের জনপ্রিয়তার আরেকটি উৎস হলো তার রাজনৈতিক বর্ণনা বা ন্যারেটিভ। তিনি নিজেকে প্রায়ই এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন যিনি সোভিয়েত-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা থেকে রাশিয়াকে পুনরুদ্ধার করেছেন, পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছেন এবং রাশিয়াকে পুনরায় একটি বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করছেন। এই বার্তা দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, বিশেষ করে তাদের কাছে যারা ১৯৯০-এর দশকের অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার স্মৃতি বহন করেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পুতিনের ক্ষমতা চিরস্থায়ী। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, জনসংখ্যাগত সংকট, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রশ্ন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং ক্ষমতাকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। ইতিহাস দেখিয়েছে, সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থাও কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবুও বর্তমান বাস্তবতায় পুতিনের ক্ষমতার ভিত্তি স্পষ্ট। নিরাপত্তা যন্ত্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের আনুগত্য, কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামো, শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা, বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বর্ণনা—এই ছয়টি স্তম্ভ তার শাসনের মূল ভিত্তি। এ কারণেই আজকের রাশিয়ায় প্রশ্নটি কেবল “পুতিন কেন টিকে আছেন?” নয়; বরং, ‘আসলেই কি কোনো পরিস্থিতি তার ক্ষমতার ভিত্তিকে নাড়া দিতে পারবে?”

