লেবাননের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অবসানের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এমন এক সময়ে তিনি এই মন্তব্য করলেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন গতি পেয়েছে এবং বিভিন্ন পক্ষ যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি বলেন, দুই দেশের ধারাবাহিক ও সক্রিয় মধ্যস্থতার ফলেই লেবানন যুদ্ধ বন্ধ করার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে এখন কূটনৈতিক সমাধানের পথকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আরাগচির দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে এবং জব্দ করা কয়েকটি সম্পদও মুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ইরানের জন্য বড় পরিসরের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে আশাবাদী বক্তব্যের পাশাপাশি সতর্কবার্তাও দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, বাস্তবে এই অগ্রগতির কার্যকারিতা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তার প্রথম বড় পরীক্ষা হবে ‘লেবানন ডি-কনফ্লিকশন সেল’। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সমঝোতা হলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে, সেটিই হবে মূল বিষয়।
অন্যদিকে, লেবাননকে ঘিরে কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে নতুন বিতর্কও তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লেবানন সরকারের চলমান প্রত্যক্ষ আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির অভিযোগ, এই আলোচনা লেবাননের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে পারে এবং পরোক্ষভাবে ইসরাইলের কৌশলগত স্বার্থকে শক্তিশালী করবে।
এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, ওয়াশিংটনে অবস্থানরত লেবাননের প্রতিনিধি দলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শর্ত মেনে নেওয়ার চাপ তৈরি করা হচ্ছে। তাদের মতে, এসব শর্ত বাস্তবায়িত হলে লেবাননের স্বাধীন নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশটি এমন এক অবস্থানে পৌঁছাবে, যা ইসরাইলপন্থী সমঝোতার পথকে আরও সহজ করে দেবে।
হিজবুল্লাহ আরও বলেছে, আলোচনার বর্তমান কাঠামো লেবাননের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে না। বরং এটি দেশটিকে এক ধরনের রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের এই অংশগ্রহণ প্রতিরোধ আন্দোলনের অবস্থানকে দুর্বল করছে এবং সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আত্মত্যাগকেও অবমূল্যায়ন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন প্রশ্ন এখন শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে ইরান, কাতার ও পাকিস্তান কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার কথা বলছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন শক্তি আলোচনার উদ্দেশ্য ও ফলাফল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে।
ফলে যুদ্ধবিরতির পথে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির দাবি সামনে এলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। আগামী দিনগুলোতে আলোচনার ফলাফল, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানই নির্ধারণ করবে লেবানন সত্যিই শান্তির দিকে এগোচ্ছে, নাকি সংকটের নতুন কোনো অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

