রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফ্রান্স। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দেশটিতে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দুই শিশুও। ২১ ও ২২ জুনের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি শুধু ফ্রান্সের জন্য নয়, পুরো ইউরোপের জন্যই একটি সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং এটি ইতোমধ্যেই মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।
ফ্রান্সের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, রোববার ও সোমবার দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরমের কারণে অন্তত ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বোর্দেওক্সে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা শহরটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই তীব্র গরমের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে বয়স্কদের মধ্যে। বোর্দেওক্সে ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী তিন প্রবীণের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কার্পেন্ত্রাস জেলায়। সেখানে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশু একটি গাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। প্রচণ্ড তাপের মধ্যে গাড়ির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় তাদের আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এদিকে গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে আরও ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। তাপপ্রবাহের কারণে অসংখ্য মানুষ নদী, হ্রদ ও সমুদ্রতীরের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এসব স্থানে নামার ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
ফ্রান্সের বেসামরিক নিরাপত্তা পরিষেবা বিভাগের মুখপাত্র জেরোম বওল্যাঙ্গার জানিয়েছেন, মানুষকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যেন তারা কেবল নজরদারির আওতায় থাকা জলাশয়ে সাঁতার কাটেন। কারণ অনিয়ন্ত্রিত জলাশয়ে নামলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সরকারও জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনেক এলাকায় দিনের সবচেয়ে গরম সময় এড়িয়ে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সংকট শুধু ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ নেই। চলতি জুন মাসে প্রায় পুরো ইউরোপই অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। স্পেনের উত্তরাঞ্চলের স্যান সেবাস্টিয়ান, যা সাধারণত শীতল আবহাওয়ার জন্য পরিচিত, সেখানে ২২ জুন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। অথচ বছরের এই সময়ে এলাকাটির তাপমাত্রা সাধারণত ২০ ডিগ্রির নিচে থাকে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যেও। দেশটির ইতিহাসে ১৯৫৭ ও ১৯৭৬ সালে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল। কিন্তু চলতি জুনে বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে, যা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কাজ করছে ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি আবহাওয়াগত ঘটনা। এর ফলে উত্তর আফ্রিকা ও সাহারা মরুভূমি থেকে উষ্ণ ও শুষ্ক বাতাস ইউরোপের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। সাধারণত বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি দ্রুত কেটে যায়, কিন্তু এবার প্রক্রিয়াটি ধীরগতির হওয়ায় গরম দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
লন্ডনের একটি শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ক্লেয়ার বার্নসের মতে, এই ধরনের তাপপ্রবাহ ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়ার চরম বৈশিষ্ট্যগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠছে। তার ভাষায়, বর্তমানে যে তাপমাত্রা ইউরোপে দেখা যাচ্ছে, তা কয়েক দশক আগেও বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতো।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি ইউরোপের জন্য শুধু একটি আবহাওয়াগত সংকট নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। তাপপ্রবাহ, পানির সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং কৃষিখাতে সম্ভাব্য ক্ষতি—সব মিলিয়ে আগামী বছরগুলোতে ইউরোপকে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
ফ্রান্সে মাত্র দুই দিনে ১৮ জনের মৃত্যু সেই বৃহত্তর সংকটেরই একটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত, যা দেখিয়ে দিচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

