সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে তেহরানের অবস্থান। দেশে ফিরে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও আলোচক দলের অন্যতম প্রধান নেতা মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে এবং এ বিষয়ে তেহরান কোনো ধরনের আপসের পথে হাঁটছে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গালিবাফ মনে করেন সাম্প্রতিক আলোচনার ফলে আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, লেবাননের পরিস্থিতি, ইরানের জ্বালানি খাতের ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা এবং বিদেশে জব্দ হয়ে থাকা ইরানি সম্পদের প্রশ্ন।
নিজের এক ভিডিও বার্তায় গালিবাফ বলেন, হরমুজ প্রণালি আর কখনো যুদ্ধ-পূর্ব বাস্তবতায় ফিরে যাবে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই জলপথ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক আলোচনার পরও তেহরান হরমুজকে নিজেদের কৌশলগত প্রভাববলয়ের বাইরে যেতে দিতে প্রস্তুত নয়।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজকে ঘিরে যেকোনো রাজনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
গালিবাফের ভাষ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আলোচনায় শুধু হরমুজ নয়, লেবানন ইস্যুতেও অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং বিদেশে আটকে থাকা অর্থ ছাড় করার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সংকেত পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে আলোচনার পর সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরানের জব্দকৃত সম্পদ নিয়ে নতুন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তার ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার যৌথভাবে এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরির কাজ করছে, যার মাধ্যমে অবমুক্ত হওয়া অর্থ সরাসরি সামরিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় হবে।
ভ্যান্সের দাবি, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো ইরানের জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে অর্থের ব্যবহারকে স্বচ্ছ রাখা। তিনি জানান, অবমুক্ত অর্থের একটি অংশ দিয়ে মার্কিন পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে, যা উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে গালিবাফের বক্তব্য কেবল একটি প্রশাসনিক অবস্থান নয়; এটি মূলত আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। সাম্প্রতিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক আলোচনা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও তেহরান দেখাতে চাইছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোরে তাদের প্রভাব অটুট রয়েছে।
ফলে সুইজারল্যান্ডের আলোচনায় কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে এখনও শেষ হয়নি, গালিবাফের সর্বশেষ বক্তব্য সেটিই আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

