ইরানের জমে থাকা অর্থ ছাড় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের অবমুক্ত অর্থ সরাসরি তেহরানের হাতে না গিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহার করা হবে। সেই অর্থ দিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য, কৃষিপণ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী কিনবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, নিজেদের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধু ইরানেরই আছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে চূড়ান্ত সমঝোতার আলোচনা চলতে থাকার মধ্যেই এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ২১ জুন ২০২৬ সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা আবার আলোচনায় বসেন। সেখানে ইরানের জমে থাকা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অর্থ এমনভাবে ব্যবহার করা হবে, যাতে ইরানের জনগণ খাদ্য পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরাও লাভবান হন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরে বলেছেন, ইরানের প্রয়োজনীয় ভুট্টা, গম, সয়াবিনসহ খাদ্যপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের কাছ থেকেই কেনা হবে। তাঁর দাবি, এতে মার্কিন কৃষকরা সন্তুষ্ট হবেন এবং ইরানের মানবিক সংকট মোকাবিলায়ও সহায়তা হবে।
কিন্তু ইরান এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, অবমুক্ত অর্থ ইরান নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করবে। কৃষিপণ্য কেনা হবে কি না, তা নির্ভর করবে দাম, মান ও প্রয়োজনের ওপর; ওয়াশিংটনের শর্তের ওপর নয়। ইরানের জেনেভাস্থ রাষ্ট্রদূত আলী বাহরাইনিও স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের সম্পদের ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ইরানই।
এই বিরোধের মূল জায়গাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে অর্থ ছাড়ের বিষয়টিকে এমনভাবে সাজাতে, যাতে তা সরাসরি ইরানের হাতে অর্থ হস্তান্তর বলে মনে না হয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইরান বিষয়ে যে রাজনৈতিক বিরোধ আছে, সেখানে সরাসরি অর্থ ছাড়কে অনেকেই দুর্বলতা হিসেবে দেখাতে পারে। তাই খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর মতো মানবিক খাতকে সামনে আনা ওয়াশিংটনের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পথ।
অন্যদিকে ইরানের দৃষ্টিতে বিষয়টি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। তেহরান মনে করে, যে অর্থ ইরানের, সেটি ব্যবহারে বাইরের কোনো রাষ্ট্র শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। ইরানের অবস্থান হলো, মানবিক সহায়তার নামে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি শান্তি আলোচনাকে এগিয়ে নিতে পারে, আবার শর্তের জটিলতায় আলোচনাকে আরও কঠিনও করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জমে থাকা অর্থ ব্যবহারের ওপর শর্ত আরোপ করা হলে দীর্ঘ আলোচনা অনিবার্য। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ গবেষক গ্যারি হাফবাউয়ার মনে করেন, এমন শর্ত মানানো সহজ হবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আইনপ্রণেতা ইরানের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও ইরানের সঙ্গে ব্যবসায় নামতে সতর্ক থাকবে, কারণ নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ঋণঝুঁকির আশঙ্কা এখনো বড় বাধা।
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগানের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক হিসাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের জমে থাকা অর্থ মার্কিন কৃষিপণ্য কেনায় ব্যবহার করতে পারলে ট্রাম্প নিজের সমর্থক কৃষকশ্রেণির কাছে এটিকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন রপ্তানিকারকরা যে ক্ষতির মুখে পড়েছেন, সেই বাস্তবতায় ইরানকে নতুন ক্রেতা হিসেবে দেখানো রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
এই প্রস্তাবকে মানবিক বাণিজ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এর ভেতরে শক্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে বলতে পারবে, তারা ইরানের জনগণের খাদ্য ও চিকিৎসা চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে। অন্যদিকে একই ব্যবস্থা মার্কিন কৃষক ও রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। ফলে মানবিক সংকট, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি—তিনটি বিষয় এখানে একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাণিজ্য এখন খুবই সীমিত। বহু দশকের নিষেধাজ্ঞা ও বৈরিতার মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে সামান্য বাণিজ্য সম্পর্ক টিকে আছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮৩৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৭৪২ মিলিয়ন ডলার ছিল সেবা খাতে। প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের সেবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরানে গেছে। পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বেশির ভাগই ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরানে রপ্তানি হওয়া পণ্য।
এই বাণিজ্যের বড় অংশ মানবিক ও নিষেধাজ্ঞামুক্ত খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য ও কিছু খাদ্যপণ্য এই সীমিত বাণিজ্যের প্রধান উপাদান। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ নয়, তবে তা স্বাভাবিক সম্পর্কের তুলনায় অত্যন্ত ছোট এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
প্রশ্ন হলো, শান্তি সমঝোতা হলে কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাণিজ্য আবার বড় আকারে ফিরতে পারে? বাস্তবতা বলছে, দ্রুত বড় ধরনের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ দুই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশই এমন নয় যে তারা সহজে পূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারবে। ওয়াশিংটনে ইরানবিরোধী অবস্থান শক্তিশালী। তেহরানেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর ব্যাপারে গভীর সন্দেহ আছে।
বিশ্লেষক কুলেন হেনড্রিক্সের মতে, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য কেনাও শুরু করে, তবু সেটি দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার দিকে যাবে না। ইরান হয়তো ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো পণ্য কিনতে পারে, কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভর করবে—এমন সম্ভাবনা কম। কারণ যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়নি, এবং উভয় পক্ষই বলেছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে সংঘাত আবার শুরু হতে পারে।
এই বাস্তবতায় ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও এখন অনেক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সতর্ক। সেখানে ইরানের মতো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র আরও বেশি সতর্ক থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক।
তবু কিছু খাতে সীমিত বাণিজ্যের সুযোগ থাকতে পারে। খাদ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্যখাতের রাসায়নিক পণ্য এবং পশুখাদ্য—এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে লেনদেন বাড়তে পারে। ইরানের খাদ্য আমদানির প্রয়োজনও কম নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, এ বছর ইরানের প্রায় ২২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। এই পরিমাণ আমদানি কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ইরানেরও যুক্তরাষ্ট্রে কিছু রপ্তানির সম্ভাবনা তাত্ত্বিকভাবে আছে। বিশেষ করে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য প্রতিযোগিতামূলক দামে দিতে পারলে তা বাজারযোগ্য হতে পারে। তবে বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক আপত্তি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার হিসাব এই সম্ভাবনাকে জটিল করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বাণিজ্যের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, আজকের বৈরিতা একসময় ছিল না। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একটি। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৭০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বাড়ে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রে তেল রপ্তানি করত, আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান, উন্নত সামরিক সরঞ্জাম, শিল্পযন্ত্র, গাড়ি, কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তি বিক্রি করত।
১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে এবং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় ফেরাতে সহায়তা করে। এরপর ওয়াশিংটন ও পাহলভি শাসনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। বোয়িং, জেনারেল ইলেকট্রিক ও বেল টেক্সট্রনের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইরানে বড় ব্যবসায়িক স্বার্থ গড়ে তোলে।
কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব সবকিছু বদলে দেয়। রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহ শাসনের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক দ্রুত ভেঙে পড়ে। একই বছর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৪৪৪ দিনের জিম্মি সংকট দুই দেশের বৈরিতাকে স্থায়ী রূপ দেয়। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করেন এবং ইরানি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে সেই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন। এরপর আবার নিষেধাজ্ঞা ও বৈরিতা তীব্র হয়।
বর্তমান আলোচনার গুরুত্ব এখানেই। একদিকে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে অর্থ ছাড়, মানবিক বাণিজ্য ও কৃষিপণ্য কেনা নিয়ে নতুন দরকষাকষি শুরু হয়েছে। এটি শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়; বরং আস্থার প্রশ্ন, ক্ষমতার প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরানের অর্থ ছাড়কে এমনভাবে ব্যবহার করতে যাতে তা মার্কিন কৃষকদের জন্য লাভজনক হয় এবং একই সঙ্গে মানবিক সহায়তার ভাষায় উপস্থাপন করা যায়। ইরান চাইছে, তার সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি। এই দুই অবস্থানের ফারাকই দেখিয়ে দেয়, শান্তি আলোচনা যতই এগোক, দুই দেশের মধ্যে সন্দেহ এখনো গভীর।
সবশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বাণিজ্য নতুনভাবে শুরু হতে পারে, তবে সেটি দ্রুত, বিস্তৃত বা সহজ হবে না। প্রথম ধাপ হতে পারে সীমিত মানবিক ও কৃষি বাণিজ্য। কিন্তু পূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক ফিরতে হলে শুধু অর্থ ছাড় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক আস্থা, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, অভ্যন্তরীণ সমর্থন এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। ইরানের জমে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলার তাই শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ইরানের সার্বভৌম অবস্থানের একটি বড় পরীক্ষাও।

