ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একের পর এক দেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের অনেক ওপরে উঠে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বৃহস্পতিবার অন্তত ১০ কোটি ১০ লাখ মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ৩৮ কোটির বেশি মানুষ ৩০ ডিগ্রির ওপরে তাপমাত্রা অনুভব করেছেন।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ইউরোপের বহু অঞ্চলে এখন যে তাপমাত্রা বিরাজ করছে, তা আফ্রিকার অনেক এলাকার চেয়েও বেশি। ফলে শুধু দৈনন্দিন জীবন নয়, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নগর ব্যবস্থাপনাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি দেশ
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি এবং যুক্তরাজ্যে। ফ্রান্সে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ৩০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। একই সময়ে জার্মানিতে প্রায় ৭ কোটি, ইতালিতে ৪ কোটি ৮০ লাখ এবং যুক্তরাজ্যে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ তীব্র গরমের প্রভাব অনুভব করেছেন।
এ ছাড়া বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসেও অস্বাভাবিকভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও পশ্চিম ইউরোপে কিছুটা স্বস্তির পূর্বাভাস রয়েছে, তবে পূর্ব ইউরোপে সপ্তাহজুড়ে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
স্পেনে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা
স্পেনে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দেশটির সরকারি মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত মাত্র চার দিনে তাপপ্রবাহ-সংশ্লিষ্ট কারণে ২১২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ মে থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাপজনিত কারণে ৩ হাজার ৮৩২ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।
চলতি সপ্তাহে দেশটিতে জুন মাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রাও রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার গড় তাপমাত্রা ছিল ২৮ দশমিক ০৮ ডিগ্রি এবং মঙ্গলবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকায় মানুষের বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ফ্রান্সেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
ফ্রান্সে তীব্র গরমের কারণে একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। প্যারিস অঞ্চলে একটি পার্ক করা গাড়ি থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সপ্তাহে গাড়ির ভেতরে তাপদাহের কারণে তিন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দেশটিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এদিকে বুধবার ফ্রান্সে ১৯৪৭ সালের পর সবচেয়ে উষ্ণ দিনের রেকর্ড হয়েছে। জাতীয় গড় তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী প্যারিসে তাপমাত্রা ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে পৌঁছায়, যা গত দেড় শতকে মাত্র চতুর্থবারের মতো ৪০ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করল।
ঘরের চেয়ে বাইরে স্বস্তি
অতিরিক্ত গরমে অনেক শহরের মানুষ ঘরের ভেতরে থাকতে পারছেন না। প্যারিসে অসংখ্য মানুষ পার্ক, উন্মুক্ত স্থান এবং খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। কেউ হ্যামকে, কেউ আবার অস্থায়ী শয্যায় রাত পার করেছেন।
বেলজিয়ামের রাজধানীতেও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত সুইমিং সুবিধা না থাকায় নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রচণ্ড গরমে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনসুবিধা নেই।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা?
চিকিৎসকদের মতে, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য এই তাপপ্রবাহ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক এবং হৃদ্রোগজনিত জটিলতার আশঙ্কা দ্রুত বেড়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে বাসিন্দাদের নিয়মিত পানি ও ফলের রস সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত অনেক প্রবীণ নিজের তৃষ্ণার কথা বুঝতে বা প্রকাশ করতে না পারায় তাদের জন্য বাড়তি নজরদারি রাখা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বর্তমান তাপপ্রবাহ কেবল একটি মৌসুমি ঘটনা নয়; এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ভূমিকা রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই শুধু জরুরি ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিকল্পনা, সবুজ নগরায়ণ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়াই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

