মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার আগেই আবারও নতুন করে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ফলে মাত্র কয়েক দিন আগে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী মালবাহী জাহাজ এমভি এভার লাভলি ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়া জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হামলার জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণ কেন্দ্র, পাশাপাশি উপকূলীয় রাডার স্থাপনাগুলোতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথে হামলা শুধু নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার জন্যই হুমকি নয়, এটি সম্প্রতি কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিরও স্পষ্ট লঙ্ঘন।
অন্যদিকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সংস্থাটির দাবি, মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন থাকা কয়েকটি স্থানে পাল্টা আঘাত হেনেছে।
আইআরজিসি আরও সতর্ক করে বলেছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি হলে ইরানের জবাব আরও কঠোর ও ব্যাপক হবে। এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সেন্টকমের হামলার ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই দক্ষিণ ইরানের সিরিক বন্দরের কাছে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ্যে আসে। ইরানের একটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১১টা ১৫ মিনিটে সিরিক বন্দরের ডক এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে ওই ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এই নতুন সামরিক উত্তেজনার ফলে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা কার্যকর থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তুলছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বহাল রয়েছে, তবুও সাম্প্রতিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন হয়। ফলে এখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ড্রোন হামলার পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এর আগে নিরাপত্তাজনিত কারণে নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।
এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ওমান নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালিতে একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক করিডোর চালু করা হবে। এই করিডোরের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। ওমানের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

