মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্যে নতুন এক কূটনৈতিক উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কয়েক দিনের ধারাবাহিক বৈঠকের পর ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবানন একটি কাঠামোগত (ফ্রেমওয়ার্ক) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এই সমঝোতাকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটানোর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির ঘোষণা দিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এটি ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তবে কূটনৈতিক এই অগ্রগতির পরও মাঠের বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি বদলে যায়নি। দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সীমিত সংঘর্ষ এখনো চলছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা পুরোপুরি কমে আসেনি। ফলে চুক্তি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হলেও পরিস্থিতি এখনো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
২৬ জুন স্বাক্ষরিত এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি কাঠামো নির্ধারণ করেছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এই আলোচনায় হিজবুল্লাহ অংশ নেয়নি। ফলে দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে সংগঠনটি তাদের যোদ্ধা সরিয়ে নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা ছিল, ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংঘাত অব্যাহত থাকলে ইরানের সঙ্গে হওয়া বৃহত্তর শান্তি সমঝোতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ সেই সমঝোতায় লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘর্ষ কমানোর অঙ্গীকার রয়েছে। তাই এই চুক্তিকে শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না দেখে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
১৪ দফার এই সমঝোতায় ইসরাইল ও লেবানন প্রথমবারের মতো একে অপরের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অধিকার স্বীকার করেছে। একই সঙ্গে নিরাপদ ও সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে পাশাপাশি বসবাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উভয় দেশ।
চুক্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্দিদের মুক্তি এবং নিহতদের মরদেহ নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রয়োজনে আত্মরক্ষার অধিকার থেকে কোনো দেশই বঞ্চিত হবে না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, পুরো লেবাননের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে দেশটির নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী। এর আগে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করা এবং তাদের সামরিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে আরব দেশগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি সামরিক সমন্বয়কারী দলও গঠন করা হবে, যারা বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে।
কূটনৈতিকভাবে এই সমঝোতা বড় অগ্রগতি হলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো জটিল। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। সীমান্তে মাঝেমধ্যেই হামলার ঘটনাও ঘটছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষের তীব্রতা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে, তবুও স্থায়ী শান্তি এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই সমঝোতাকে দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘ অস্থিরতার পর এই উদ্যোগ লেবাননের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। বর্তমানে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের প্রায় ৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে লেবাননের সেনাবাহিনীকে দুটি এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হবে। একটি লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং অন্যটি নদীর উত্তরে। এই ব্যবস্থা সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত এলাকায় দায়িত্ব হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই দীর্ঘ সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪ হাজার ১৯২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৬০০ জনের বেশি এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১২ লাখেরও বেশি মানুষ।
অন্যদিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে সীমান্তের দুই পাশে ৩৬ জন ইসরাইলি সেনা এবং ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এই কাঠামোগত চুক্তি নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নয়। কারণ সংঘাতের অন্যতম প্রধান পক্ষ হিজবুল্লাহ এই সমঝোতার অংশ নয়, সীমান্তে এখনো উত্তেজনা বজায় রয়েছে এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনা অবস্থান করছে।
ফলে এই চুক্তির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। লেবাননের রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে দেশের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, হিজবুল্লাহ ভবিষ্যতে কী অবস্থান নেয় এবং দুই দেশ রাজনৈতিক সমঝোতার পথে কতটা আন্তরিকভাবে এগিয়ে যায়—এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে এই চুক্তি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়তে পারবে, নাকি এটি কেবল আরেকটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির অধ্যায় হয়ে থাকবে।

