আফগানিস্তান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ বছর পরও সেই যুদ্ধের হিসাব শেষ হয়নি। বরং সময় যত যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এই যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক অভিযান ছিল না; এটি ছিল ভয়, ভুল অনুমান, রাজনৈতিক দ্বিধা, সামরিক জেদ এবং জাতীয় স্মৃতিভ্রংশের এক দীর্ঘ গল্প।
বিশ বছর ধরে চলা আমেরিকার আফগান যুদ্ধ ২০২১ সালে এক অস্বস্তিকর ও অপমানজনক সমাপ্তি পায়। এপ্রিল ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চূড়ান্ত সেনা প্রত্যাহার শুরু করে। লক্ষ্য ছিল সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকি থাকা ২,৫০০ মার্কিন সেনাকে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু প্রত্যাহার শুরু হতেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবান একের পর এক এলাকা দখল করতে থাকে, আফগান সরকারি বাহিনী ভেঙে পড়ে, আর আগস্টের শুরুতে অধিকাংশ প্রাদেশিক রাজধানী তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
শেষ আঘাত আসে ১৫ আগস্ট ২০২১। সেদিন কাবুলে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকার ভেঙে পড়ে। আতঙ্কিত হাজার হাজার মানুষ বিমানবন্দরের দিকে ছুটে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্ররা এবং কিছু বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে প্রায় ১২০,০০০ মানুষকে বিমানে করে সরিয়ে নেয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তেও রক্তপাত থামেনি। শেষ মার্কিন সেনা ৩০ আগস্ট আফগানিস্তান ছাড়ার চার দিন আগে বিমানবন্দরে আত্মঘাতী হামলায় ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। দুই দশকের প্রচেষ্টা শেষ হয় লজ্জা, হতাশা ও অসমাপ্ত প্রশ্ন রেখে।
এই যুদ্ধের মূল যুক্তি ছিল সন্ত্রাসবাদ ঠেকানো। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আমেরিকান নেতৃত্বের ধারণা ছিল, আফগানিস্তান ছেড়ে দিলে দেশটি আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হবে। এই ভয়ই একের পর এক প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে সেনা রেখে যেতে প্রভাবিত করেছিল। এমনকি যখন যুদ্ধের লক্ষ্য ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল, তখনও এই যুক্তিই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তকে ধরে রাখে।
কিন্তু পাঁচ বছর পর বাস্তবতা সেই ভয়কে নতুন আলোয় দাঁড় করিয়েছে। গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানভিত্তিক কোনো গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাসী হামলাও চালায়নি। অথচ এই যুদ্ধের পেছনে ওয়াশিংটন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। ১২০,০০০–এর বেশি আফগান বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন। ৭৭৫,০০০–এর বেশি মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে মোতায়েন হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২০,৭০০–এর বেশি আহত হন এবং ২,৪০০–এর বেশি নিহত হন। এত বিশাল মূল্য দেওয়া হয়েছিল এমন এক আশঙ্কার বিরুদ্ধে, যা পরে অতিরঞ্জিত বলে মনে হচ্ছে।
এখানেই আফগান যুদ্ধের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি উঠে আসে। যদি আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা তখন জানতেন, যা তারা এখন জানেন, তাহলে কি তারা আরও আগে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে দাঁড়াতেন? সম্ভবত হ্যাঁ। কিন্তু এই স্বীকারোক্তি সহজ নয়। কারণ এটি শুধু একটি নীতির ভুল নয়; এটি নেতৃত্বের বিচারবোধ, গোয়েন্দা মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা, সামরিক প্রতিষ্ঠানের মানসিকতা এবং পরাজয় মেনে নিতে না পারার প্রবণতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
৭ অক্টোবর ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার জবাব দেওয়া এবং আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা। মার্কিন বিমানশক্তি, বিশেষ অভিযান বাহিনী, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং উত্তর জোটের সহায়তায় কয়েক মাসের মধ্যেই আল-কায়েদা ছত্রভঙ্গ হয় এবং মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবান সরকার উৎখাত হয়। হামিদ কারজাইয়ের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।
প্রথম কয়েক বছর আফগানিস্তান তুলনামূলক শান্ত ছিল। এই প্রাথমিক সাফল্য ওয়াশিংটনকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ২০০৩ সালে বুশ প্রশাসন ইরাক আক্রমণ করে, আর আফগানিস্তান ধীরে ধীরে মনোযোগের বাইরে যেতে থাকে। ঠিক সেই সময় তালেবান আবার সংগঠিত হয়। ২০০৬ সালের মধ্যে তারা জমি ফিরে পেতে শুরু করে এবং আফগান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
এই সময় আমেরিকার রাজনীতি ও সমাজ সন্ত্রাসভীতিতে আচ্ছন্ন ছিল। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা, অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক, ইউরোপে জিহাদি হামলা ও ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে সন্ত্রাসবাদ ছিল মার্কিন নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রবিন্দু। আফগানিস্তানকে দেখা হচ্ছিল সেই লড়াইয়ের প্রধান মঞ্চ হিসেবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র গঠন, আফগান সেনা তৈরি—এসব লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মূল চালিকাশক্তি ছিল সন্ত্রাসবাদ ঠেকানো।
তবে মাটির বাস্তবতা সব সময় এত সরল ছিল না। অনেক মার্কিন সেনা প্রত্যন্ত পাহাড়, মরুভূমি ও গ্রামে স্থানীয় তালেবানের সঙ্গে লড়ছিলেন। তাঁদের কাজ ছিল কখনও টহল, কখনও রাস্তার বোমা এড়ানো, কখনও দুর্বল আফগান প্রশাসনকে ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বড় ভাষণ আর মাঠের দৈনন্দিন বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক ছিল। ফলে অনেক সেনার মনে প্রশ্ন জন্মায়—তারা আসলে কিসের জন্য লড়ছে?
২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে দক্ষিণের হেলমান্দ প্রদেশের গার্মসের এলাকায় মার্কিন বেসামরিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা অভিজ্ঞতার মধ্যেও এই দ্বিধা দেখা যায়। স্থানীয় অনেক আফগান বিশ্বাস করতেন, মার্কিন বাহিনী চলে গেলে তালেবান ফিরে আসবে। কেউ কেউ বলতেন, আল-কায়েদাও ফিরবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে আল-কায়েদার সক্রিয় উপস্থিতির স্পষ্ট প্রমাণ খুব কম ছিল। তখন আফগানিস্তানে প্রায় ১০০,০০০ মার্কিন সেনা ছিল। এমন অস্পষ্ট হুমকির বিপরীতে এত বড় সামরিক উপস্থিতি কতটা যৌক্তিক—এই প্রশ্ন ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তারপরও স্থানীয় সাফল্য ছিল। গার্মসেরের বেশির ভাগ এলাকা থেকে তালেবানকে সরানো হয়েছিল। আফগান সরকারি কর্মকর্তা অস্ত্র ছাড়াই অঞ্চলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে পারতেন। ১,০০০–এর বেশি নতুন আফগান সেনা ও পুলিশ সক্রিয় ছিল। এই সাফল্য অনেককে বিশ্বাস করিয়েছিল যে, বিপুল সেনা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সীমিত মার্কিন উপস্থিতি রাখা দরকার। ২০১২ সালে প্রস্তাব করা হয়েছিল, ২৫,০০০ মার্কিন উপদেষ্টা, বিশেষ অভিযান বাহিনী, বিমান ও সহায়তা কর্মী থেকে গেলে আফগান সরকার টিকে থাকতে পারে এবং আল-কায়েদার প্রত্যাবর্তন ঠেকানো যেতে পারে।
কিন্তু ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা আরও কঠিন বাস্তবতা দেখায়। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেনা কমাতে শুরু করেছিলেন। তখন আফগান যুদ্ধের দায়িত্ব ক্রমে আফগান সেনা ও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে হেলমান্দের সাংগিন অঞ্চলে শত শত সশস্ত্র আফগান পুলিশ ও সেনা তালেবান আক্রমণে পরাজিত হয়। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে আরও বিপর্যয় দেখা দেয়। এসব ঘটনা ওয়াশিংটনের অনেক কর্মকর্তার কাছে প্রমাণ হয়ে ওঠে যে, আফগান সরকার একা তালেবান ঠেকাতে পারবে না।
২০১২ সাল থেকে মার্কিন গোয়েন্দা মহলের মূল্যায়ন ছিল, যুক্তরাষ্ট্র সেনা সরিয়ে নিলে এক থেকে তিন বছরের মধ্যে আফগানিস্তানে এমন সন্ত্রাসী সক্ষমতা আবার তৈরি হতে পারে, যা আমেরিকায় হামলার ঝুঁকি বাড়াবে। এই মূল্যায়নই আফগানিস্তানে থেকে যাওয়ার যুক্তিকে শক্তিশালী করে। কিন্তু পরে দেখা গেল, এই ঝুঁকি যতটা নিশ্চিত ধরে নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবতা ততটা সরল ছিল না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর শুরুতে ওবামার নীতির মূল কাঠামো বজায় রাখেন। কিন্তু ২০১৮ সালের মাঝামাঝি তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আফগানিস্তান থেকে বের হতে হবে এবং সরাসরি তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হয়। চুক্তিতে বলা হয়, ওয়াশিংটন মে ২০২১ সালের মধ্যে সব সেনা সরিয়ে নেবে। বিনিময়ে তালেবান প্রতিশ্রুতি দেয়, আল-কায়েদাকে আফগানিস্তানে সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ বা অভিযান চালাতে দেওয়া হবে না। তবে তালেবান আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতে রাজি হয়নি।
জানুয়ারি ২০২১ সালে জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েন। তিনি চাইলে ২,৫০০ সেনা রেখে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালাতে পারতেন, অথবা ট্রাম্পের চুক্তি অনুযায়ী বের হয়ে আসতে পারতেন। মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশ থাকার পক্ষে ছিল। তাঁদের যুক্তি ছিল, আফগানিস্তানের ভেতর থেকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানো সহজ এবং মার্কিন সেনা থাকলে আফগান সরকার দ্রুত ভেঙে পড়বে না।
বাইডেন সন্ত্রাসবাদ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, কাবুলের পতন সাইগনের মতো দৃশ্য তৈরি করতে পারে—এ কথাও তিনি জানতেন। কিন্তু তাঁর কাছে করোনাভাইরাস মহামারি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং মার্কিন অর্থনীতি ছিল বড় অগ্রাধিকার। এপ্রিল ২০২১ সালে তিনি ঘোষণা করেন, ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ছাড়বে। প্রশাসনের ধারণা ছিল, সেনা প্রত্যাহারের পর আফগান সরকার অন্তত ছয় মাস টিকবে। বাস্তবে কাবুল পড়ে যায় আগস্টেই।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর তাদের শাসন নিয়ে অনেক ভয় ছিল। দলটির শীর্ষ নেতা মাওলভি হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ২০১৬ সালে নেতৃত্বে আসেন। এর আগে তিনি তালেবানের ইসলামি আদালতের প্রধান বিচারক ছিলেন। বলা হয়, ২০১৮ সালে হেলমান্দে নিজের ছেলের আত্মঘাতী হামলাকেও তিনি অনুমোদন করেছিলেন। তিনি কাবুল নয়, কান্দাহার থেকে শাসন করেন এবং জনসমক্ষে খুব কম আসেন। অন্যদিকে কাবুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন সিরাজুদ্দিন হাক্কানি, যিনি হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা এবং যুদ্ধকালে বহু আত্মঘাতী হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৭ সালে জার্মান দূতাবাসের সামনে ট্রাকবোমা হামলায় ১৫০ আফগান নিহত এবং ৪০০–এর বেশি আহত হন।
এ ধরনের ব্যক্তিদের ক্ষমতায় ফেরা ছিল ঠিক সেই দৃশ্য, যা মার্কিন কর্মকর্তারা ভয় করতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তালেবান শাসন আফগানিস্তানে সর্বাত্মক বিশৃঙ্খলা তৈরি করেনি। গত পাঁচ বছর দেশটি তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আক্রমণের পর এটিই আফগানিস্তানের সবচেয়ে দীর্ঘ শান্ত সময়। ইসলামিক স্টেটের বিচ্ছিন্ন হামলা ছাড়া তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে বড় প্রতিরোধ দেখা যায়নি। অনেক আফগান এখন দেশকে শান্ত বলে বর্ণনা করেন।
তালেবান সব জায়গায় নিষ্ঠুর দমননীতি চালায়নি—এটিও অনেকের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। যারা যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র বা আগের আফগান সরকারের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, তাঁদের সবাইকে পদ্ধতিগতভাবে কারাগারে পাঠানো হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে তালেবান গভর্নর ও বিচারকেরা তাঁদের স্বাভাবিক জীবন চালাতে দিয়েছেন। তবে নিচু পর্যায়ের তালেবান সদস্যের ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা স্থানীয় শত্রুতার ঝুঁকি রয়ে গেছে।
তালেবান শাসনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপগুলোর একটি হলো পপি চাষ নিষিদ্ধ করা। যুদ্ধের সময় পপি তালেবানের আয়ের বড় উৎস ছিল। কিন্তু ২০২২ সালে হাইবাতুল্লাহ সব ধরনের মাদক চাষ, বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন। প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত, দীর্ঘ কারাদণ্ড এবং চাষ ধ্বংসের মাধ্যমে এই নির্দেশ কার্যকর করা হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পপি চাষ প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে যায়। অথচ এতে তালেবানের কর আয় কমে এবং সম্ভবত দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এই তুলনামূলক স্থিতির পাশাপাশি গভীর অন্ধকারও আছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেমে গেছে, দারিদ্র্য বেড়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হওয়ায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত এসেছে নারীদের জীবনে। ২০২২ সালে হাইবাতুল্লাহ মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিষিদ্ধ করেন। নারীদের কাজ করা এবং পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে যাওয়ার ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন নারীদের আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, কারণ হাসপাতাল ও ক্লিনিক ছিল নারীদের সেবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের একটি।
এই নীতিগুলো আরও নির্মম মনে হয়, কারণ ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে আফগান নারীদের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হয়েছিল। অন্তত কাবুলে একটি প্রজন্ম শিক্ষা, চাকরি এবং নিজের জীবন গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। তালেবান সেই স্বপ্নের বড় অংশ নিভিয়ে দিয়েছে।
তবু যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা স্বার্থের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো পরিচিত সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। আল-কায়েদা আফগান ভূখণ্ডে বড় আকারে সংগঠন, অর্থ সংগ্রহ বা প্রশিক্ষণ চালাচ্ছে—এমন প্রমাণও সীমিত। তবে ঝুঁকি পুরোপুরি নেই বলা যায় না। পাকিস্তানি তালেবানের যোদ্ধা ও নেতারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে ৭০০ হামলা চালিয়েছে। এর জেরে পাকিস্তান বাগরাম, কাবুল, পাকতিয়া ও কান্দাহারে বোমা হামলা করেছে, আর আফগান বাহিনী পাকিস্তানি সীমান্তচৌকিতে হামলা চালিয়েছে।
আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের কয়েক হাজার যোদ্ধাও আছে। তারা কাবুলে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে বড় হামলা করেছে। ২০২২ সালে মার্কিন হামলায় আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি নিহত হন, যিনি ওসামা বিন লাদেনের পর সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়েছিলেন। তিনি হাক্কানি-সংশ্লিষ্ট একটি অতিথিশালায় ছিলেন। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেন, আফগানিস্তানে প্রায় ৪০০ আল-কায়েদা সদস্য এখনও ঘাঁটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
এসব সতর্ক সংকেত গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান পর্যবেক্ষণে ওয়াশিংটনের ক্ষমতা এখন ২০২০ সালের মতো নয়, ২০১১ সালের মতো তো নয়ই। পাহাড়ি গ্রাম বা কাবুল, কান্দাহার ও জালালাবাদের গলিতে সন্ত্রাসী পরিকল্পনা হলে তা ধরা কঠিন হতে পারে। তবু এখন পর্যন্ত স্পষ্ট বাস্তবতা হলো—তালেবান শাসন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য যতটা ভয়াবহ হবে বলা হয়েছিল, তা হয়নি।
তাহলে প্রশ্ন হলো, কেন ওয়াশিংটন এত দীর্ঘ সময় আফগানিস্তানে থাকল? একটি কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ১১ সেপ্টেম্বরের পর সাধারণ আমেরিকানদের মনে জিহাদি সন্ত্রাসের ভয় গভীর ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে যুদ্ধের দৈনন্দিন কষ্ট তারা সরাসরি অনুভব করছিল না। বড় কোনো জনবিক্ষোভ বা নির্বাচনভিত্তিক চাপ তৈরি হয়নি, যা প্রেসিডেন্টকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করত। অন্যদিকে দ্রুত প্রত্যাহারের পর যদি কাবুল ভেঙে পড়ত, সেটি রাজনৈতিক বিপর্যয় হতো—যেমন ২০২১ সালে বাইডেনের ক্ষেত্রে হয়েছিল।
ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর, মে ২০১১–এর পরবর্তী বছরগুলো ছিল যুদ্ধ শেষ করার সেরা সুযোগগুলোর একটি। আল-কায়েদা দুর্বল ছিল, আমেরিকার সবচেয়ে কুখ্যাত শত্রু নিহত হয়েছিল, এবং ২০০৯ সালে ওবামা যে অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছিলেন তা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছিল। বিন লাদেনের মৃত্যুর প্রায় এক মাস পর ওবামা ঘোষণা করেন, সেপ্টেম্বর ২০১২ সালের মধ্যে ৩৩,০০০ মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ছাড়বে। তখনও প্রায় ৬৭,০০০ সেনা দেশে থাকবে। পরে ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ যুদ্ধ অভিযান শেষ করে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সন্ত্রাসবিরোধী মিশনে যাওয়ার কথা বলা হয়। মে ২০১৪ সালে ওবামা জানান, ২০১৬ সালের শেষ নাগাদ প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে। কিন্তু পরের বছর ইসলামিক স্টেটের উত্থান এবং আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রগতির কারণে তিনি সিদ্ধান্ত বদলান।
আরেকটি গভীর কারণ ছিল পরাজয়ের অপমান এড়ানোর প্রবণতা। সেনাবাহিনীর জন্য এটি সহজ বিষয় নয়। অনেক জেনারেল মনে করতেন, তালেবানের বিজয় মানে শুধু নীতির ব্যর্থতা নয়; এটি হবে যুদ্ধক্ষেত্রে সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে অর্থহীন করে দেওয়ার মতো। সেনারা লড়াই করে জিততে শেখে। তারা মিত্রদের জন্য দায়বদ্ধতা অনুভব করে। মাঠে থাকা একজন কর্মকর্তা বা সৈনিকের আবেগগত প্রতিশ্রুতি নীতিনির্ধারকের ঠান্ডা হিসাবের মতো নয়। এই মানবিক সত্যও যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে।
তালেবানও পরিস্থিতি সহজ করেনি। ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার বলেছে, আফগান ভূখণ্ড থেকে বিদেশে সন্ত্রাসী হামলা হতে দেবে না। কিন্তু একই সঙ্গে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ২০১৯ সালে কাতারে আলোচনায় তালেবান প্রতিনিধিরা আল-কায়েদার সঙ্গে কাজ করার কথা স্বীকার করলেও আল-কায়েদার অর্থ সংগ্রহ, সদস্য নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিষিদ্ধ করার লিখিত নিশ্চয়তা দিতে অনীহা দেখায়। ফলে ওয়াশিংটনের সন্দেহ আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আরেকটি বড় সমস্যা ছিল গোয়েন্দা মূল্যায়নের ধরন। বিভিন্ন মার্কিন সংস্থার মধ্যে সাধারণ ধারণা ছিল, সেনা প্রত্যাহারের পর সন্ত্রাসী হুমকি বাড়বে। কিন্তু এই মূল্যায়ন অনেকটা ঐকমত্যনির্ভর ছিল। ভিন্নমত ছিল, কিন্তু তা শক্তিশালীভাবে নীতিনির্ধারকদের সামনে আসেনি। সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের উচিত ছিল একাধিক সম্ভাব্য পূর্বাভাস চাওয়া—শুধু সবচেয়ে ভীতিকর বা প্রচলিত অনুমান নয়। এমন পূর্বাভাস হয়তো দেখাতে পারত যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হুমকি দীর্ঘ সময় কমই থাকতে পারে।
ওয়াশিংটন তালেবানকেও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। তাদের নেতৃত্ব গোপনে থাকত, বাইরের লোকজনের প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল। মোল্লা ওমর ২০১৩ সালে মারা যান, কিন্তু বাইরের বিশ্ব এবং তালেবানের অনেক সদস্যও তা জানতে পারে দুই বছর পরে। নব্বইয়ের দশকে তালেবান শাসনের যে ছবি পশ্চিমা নীতিনির্ধারণে গভীরভাবে বসেছিল, সেটি আংশিক সত্য হলেও পূর্ণ বাস্তবতা ছিল না। আফগান উপজাতীয় রাজনীতির জটিলতা এবং দুর্বল সরকারি তথ্যও তালেবানের ঐক্য ও কাঠামো সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করেছিল।
যদি ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে তালেবানের সঙ্গে আরও শক্তিশালী ও ধারাবাহিক সংলাপ হতো, তাহলে হয়তো ওয়াশিংটন তাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারত। হয়তো যুদ্ধ শেষ করার আলোচনা আরও আগে এগোতে পারত। কিন্তু সেই উদ্যোগ যথেষ্ট গুরুত্ব ও সম্পদ পায়নি।
আফগান যুদ্ধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, যারা সেখানে লড়েছে তাদের অনেকেই এখন যুদ্ধটিকে অপচয় হিসেবে দেখেন। আগস্ট ২০২১ সালের এক জরিপে দেখা যায়, সব আমেরিকান যুদ্ধের সাবেক সেনাদের দুই-তৃতীয়াংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে নিজের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক সেনা ভাবেন, তাঁদের আত্মত্যাগ কি বৃথা গেল? কেউ কেউ মনে করেন, যুদ্ধ ছিল কর্তব্য; রাষ্ট্রের ডাকে তারা সাড়া দিয়েছেন। আবার ছোট একটি অংশ বিশ্বাস করে, আরও সেনা থাকলে, বিশেষ অভিযান জোরদার হলে, আফগান সেনাবাহিনী ভালোভাবে গড়া হলে বা ওয়াশিংটন বারবার প্রত্যাহারের বার্তা না দিলে যুদ্ধ জেতা সম্ভব ছিল।
এই ভিন্ন স্মৃতি মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের জন্য জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। সেনাদের সামনে তাদের প্রমাণ করতে হয়, তারা জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে না এমন কাজে, যার লক্ষ্য স্পষ্ট নয়। আবার বেসামরিক নেতাদের সামনে প্রমাণ করতে হয়, তারা নীতির পথে বাধা হবে না। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আমেরিকা এমন সংকট দেখেছিল। সেই অভিজ্ঞতা সেনাবাহিনীকে বদলে দিয়েছিল। আফগানিস্তানের পরাজয়ও হয়তো সামরিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক বিচারবোধ এবং যুদ্ধের যুক্তি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন সতর্কতা আনতে পারে।
শেষ পর্যন্ত আফগান যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের জীবনের মূল্য। দীর্ঘ সময় আমেরিকার অনেক নেতা ও সাধারণ মানুষ ভেবেছিলেন, নিরাপত্তার লাভ প্রাণহানির খরচের চেয়ে বেশি। এখন খুব কম মানুষ সেই মূল্যায়নে নিশ্চিত। ভিয়েতনাম ও ইরাক যুদ্ধের পরও একই ধরনের মানসিক পরিবর্তন দেখা গেছে। যুদ্ধের সময় সবকিছু জরুরি মনে হয়। পরে ইতিহাসের দূরত্ব থেকে মানুষ ভাবে—আগে যদি জানতাম, তাহলে এত মূল্য দিতাম না।
আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই শুধু তালেবান, আল-কায়েদা বা কাবুলের পতন নিয়ে নয়। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ভয় যখন রাষ্ট্রনীতির প্রধান চালক হয়ে ওঠে, তখন দেশগুলো দীর্ঘ যুদ্ধকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। আর যুদ্ধ শেষ হলে তারা দ্রুত ভুলে যেতে চায় কেন এতদিন সেখানে ছিল।
এই ভুলে যাওয়াই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ স্মৃতি হারালে একই ধরনের ভয়, একই ধরনের অতিরঞ্জিত হুমকি এবং একই ধরনের রাজনৈতিক দ্বিধা ভবিষ্যতে আবার নতুন যুদ্ধের দরজা খুলে দিতে পারে। আফগানিস্তান তাই শুধু অতীতের ব্যর্থতা নয়; এটি ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা।

