মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর অনেকেই দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের বড় লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, আর ইরান কোনোভাবে টিকে থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে এমন ধারণা অস্বাভাবিক নয়। কারণ তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর তেহরানের সরকার পতন ঘটেনি, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও পুরোপুরি শেষ হয়নি, আর যুদ্ধ শেষ করতে ওয়াশিংটনকে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথে যেতে হয়েছে।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রাজনীতিকে শুধু একটি যুদ্ধবিরতি বা একটি সামরিক অভিযানের ফল দিয়ে মাপলে পুরো ছবিটি বোঝা যায় না। বড় প্রশ্ন হলো, ইরান কি সত্যিই এই যুদ্ধ থেকে শক্তিশালী হয়ে বেরিয়েছে, নাকি আপাতভাবে টিকে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে আরও দুর্বল অবস্থানে চলে গেছে?
জেমস এফ জেফ্রির বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, ইরান এই যুদ্ধে প্রকৃত অর্থে জয়ী হয়নি। বরং তেহরান এখনও দীর্ঘমেয়াদি খেলায় পিছিয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি—এ কথা সত্য। কিন্তু গত প্রায় তিন বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে ধারাবাহিক সংঘাত চলছে, তার সামগ্রিক ফল দেখলে বোঝা যায়, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত অবস্থান বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়েছে।
এই সংঘাতের সূচনা হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের ইসরায়েলে হামলার মাধ্যমে। এরপর গাজা, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, লোহিত সাগর, ইরান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের বসন্তে অভিযান এপিক ফিউরি সেই দীর্ঘ সংঘাতকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যায়। যুদ্ধের সাম্প্রতিক পর্ব শেষ হলেও এর প্রভাব এখনও শেষ হয়নি।
ওয়াশিংটনের অনেক মহলে ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমালোচকদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানের সরকার উৎখাত করতে পারেনি, ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকি স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারেনি, আর যুদ্ধের শেষে ইরান এখনও রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই মূল্যায়ন অনেকটাই তাৎক্ষণিক। কৌশলগত হিসাব করলে দেখা যায়, ইরানের সামনে এখন আগের চেয়ে বেশি সীমাবদ্ধতা, বেশি চাপ এবং কম বিকল্প রয়েছে।
গত তিন বছরে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার আঞ্চলিক মিত্র ও ছায়াযোদ্ধা নেটওয়ার্ক। হামাস, হিজবুল্লাহ, ইরাকি মিলিশিয়া, ইয়েমেনের হুতি এবং সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের মাধ্যমে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করত। এই নেটওয়ার্ক সরাসরি যুদ্ধ না করেও ইরানকে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ দিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের পর সেই কাঠামো আগের মতো কার্যকর নেই।
হামাস গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। হিজবুল্লাহ লেবাননে বড় সামরিক চাপে পড়েছে। সিরিয়ায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র বাশার আল আসাদ আর ক্ষমতায় নেই। ইরাকি রাজনীতিতেও তেহরানপন্থী শক্তির প্রভাব আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়। ইয়েমেনের হুতিরা আগের পর্যায়ের মতো বিস্তৃত আঘাত হানতে পারেনি। ফলে ইরান যে বহুমুখী চাপের কৌশল দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করত, সেটি এখন ভেঙে পড়া বা অন্তত গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের মিত্ররা সাম্প্রতিক সংঘাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় হয়নি। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের সময় ইরাকি মিলিশিয়া ও ইয়েমেনের হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজে শত শত হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু নতুন সংঘাতের সময় এই নেটওয়ার্কের বেশির ভাগ অংশ তুলনামূলকভাবে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এটি তেহরানের জন্য কৌশলগত সতর্কবার্তা। যার ওপর ভর করে ইরান এতদিন আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই কাঠামো আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়।
ইরানের আরেকটি বড় ক্ষতি হয়েছে সামরিক সক্ষমতায়। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অবকাঠামো, সামরিক শিল্প এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়েছে। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দেড় হাজারের বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তু এবং এক হাজার দুইশ পঞ্চাশটি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগারে আঘাত করেছে। ইরানের নিজস্ব হিসাবেই যুদ্ধের ক্ষতির পরিমাণ ২৭০ বিলিয়ন ডলার।
এই পরিসংখ্যান শুধু সামরিক ক্ষতির চিত্র দেয় না; এটি ইরানের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সীমাবদ্ধতারও ইঙ্গিত দেয়। কারণ আকাশ প্রতিরক্ষা দুর্বল হলে পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং সামরিক কারখানা রক্ষা করা কঠিন হয়। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত নষ্ট হলে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর ক্ষমতা কমে যায়। আর অর্থনৈতিক ক্ষতি এত বড় হলে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক পুনর্গঠনও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
তবে ইরানের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের অস্ত্র ছিল—হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ক্ষমতা। সাম্প্রতিক সংঘাতে তেহরান সেই অস্ত্র ব্যবহার করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়া দিতে পেরেছে। তেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে, বিভিন্ন দেশ ও ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলেও এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ করলে শুধু বিশ্ব অর্থনীতি নয়, ইরান নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানির পথও সীমিত। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে দেশগুলো বিকল্প সরবরাহকারী, নতুন জ্বালানি উৎস এবং ভিন্ন পরিবহনপথ খুঁজে নিতে শুরু করে। ফলে হরমুজ বন্ধের অস্ত্র যত বেশি ব্যবহৃত হয়, ততই তার কার্যকারিতা কমার ঝুঁকি বাড়ে।
এবারের সংকটে দেখা গেছে, রাষ্ট্র ও জ্বালানি কোম্পানিগুলো দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে নিতে শুরু করেছে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দিনে ৫৬ লাখ ব্যারেলের রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। সৌদি আরব হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে দিনে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে, যা উপসাগরীয় রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতও নতুন পাইপলাইন নির্মাণের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ করেছে, যা তাদের স্থলপথে পরিবহন সক্ষমতা দিনে ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
এই বাস্তবতা ইরানের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ হরমুজ প্রণালী একসময় তেহরানের শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্র ছিল। কিন্তু যদি বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে সেই পথের ওপর নির্ভরতা কমাতে শুরু করে, তাহলে ইরানের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতাও কমবে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে হরমুজ বন্ধ করে ইরান ক্ষতি করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটি নিজেকেই দুর্বল করতে পারে।
ইরান যুদ্ধের পর আসল পরীক্ষা হবে তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে। সমঝোতা স্মারকের অধীনে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট ও সক্রিয় পদক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি সীমিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পাতলা করার প্রসঙ্গ এসেছে। এই মাত্রা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধতার কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সমঝোতা স্মারকে সমৃদ্ধকরণ ইস্যুর সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বলতে পারে—সমৃদ্ধকরণ সীমিত করো, বিনিময়ে যুদ্ধবিরতি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার সুযোগ পাওয়া যাবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র আসলে ইরানের মজুত ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করতে পারে কি না এবং ভবিষ্যতে তেহরানকে নতুন করে সমৃদ্ধকরণের পথে যেতে বাধা দিতে পারে কি না।
অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে থাকলেই ভালো করত। তাদের যুক্তি, ওই চুক্তিতে থাকলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যেত। কিন্তু জেফ্রির বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ২০১৫ সালের চুক্তি ইরানের কর্মসূচিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করেনি; বরং সাময়িক সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। ওই সীমাবদ্ধতাগুলো ধাপে ধাপে উঠে যাওয়ার কথা ছিল, এবং কয়েক বছরের মধ্যে ইরান দ্রুতগতিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেতে পারত।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কিছু নতুন চাপের উপাদান রয়েছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে গিয়ে যে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তা ইরানের ওপর চাপ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আঘাতে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর বড় ক্ষতি। ফলে ওয়াশিংটন এখন আলোচনার টেবিলে আগের চেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুরোপুরি নিখুঁত নয়। যুদ্ধের সময় ইসরায়েল, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের মতবিরোধ স্পষ্ট হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডের ঘাঁটি ব্যবহার করে কিছু যুক্তরাষ্ট্রের বিমান অভিযান চালাতে বাধা দিয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগেও সরাসরি অংশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, কারণ সেটি যুদ্ধবিরতির আহ্বানকে দুর্বল করছিল। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের মতভেদ দেখা দেয়, বিশেষ করে ইরানে হামলার আগে পর্যাপ্ত পরামর্শ না করা এবং প্রণালী খুলে দিতে ইউরোপের সীমিত ভূমিকা নিয়ে।
কিন্তু এসব মতবিরোধ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা সহজে ওয়াশিংটন ছেড়ে অন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যাবে—এমন সম্ভাবনা কম। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিকভাবে বেশ বিচ্ছিন্ন, এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী বৈশ্বিক পৃষ্ঠপোষক তার আর নেই। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কিছুটা কমাতে চাইছে, কিন্তু ইরানি হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প এখনো তাদের হাতে নেই।
১৫ জুন থেকে ১৭ জুন অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনও যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের মধ্যে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি—এমন বার্তা দেয়। ট্রাম্প ইরান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরব নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করেছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে কঠোর ভাষার ঘোষণায় সম্মতি দিয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তাকে ভার্সাইয়ে সম্মান জানান। এসব ঘটনা দেখায়, যুদ্ধ নিয়ে অস্বস্তি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা এখনও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য।
তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধকে নিখুঁত কৌশল বলা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য স্থির করেছিল। তেহরানের সরকার উৎখাত, পারমাণবিক হুমকি পুরোপুরি শেষ করা, আঞ্চলিক প্রভাব ভেঙে দেওয়া—এসব লক্ষ্য এক অভিযানে অর্জন করা বাস্তবসম্মত ছিল না।মতাদর্শনির্ভর প্রতিপক্ষকে সামরিক আঘাতে দ্রুত সরিয়ে দেওয়া কঠিন—হিজবুল্লাহ, তালেবান এবং ইসলামিক স্টেটের অভিজ্ঞতা আগেই তা দেখিয়েছে।
সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে না দেখা। হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঝুঁকি বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় আলোচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতে সেই ঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে যুদ্ধ মোট বিজয় এনে দিতে পারেনি।
তবু এটিকে সরলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় বা ইরানের বিজয় বলা কঠিন। কারণ গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররা ইরানের আগের ২০ বছরের আঞ্চলিক সাফল্যের অনেকটাই উল্টে দিয়েছে। তেহরানের মিত্র নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়েছে, আসাদ আর ক্ষমতায় নেই, হিজবুল্লাহ চাপের মুখে, ইরানের সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত, পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার টেবিলে এসেছে, আর হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর আন্তর্জাতিক প্রবণতা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত ইরানের সরকার উৎখাত নয়, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু ইরানকে ২০২৩ সালের আগের তুলনায় দুর্বল অবস্থায় ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। সেটিই যদি হয় মূল লক্ষ্য, তাহলে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পুরোপুরি ব্যর্থ নয়।
ইরানের জন্যও বাস্তবতা কঠিন। তেহরান টিকে গেছে, কিন্তু আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। তার মিত্ররা দুর্বল, অর্থনীতি চাপে, সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত, পারমাণবিক কর্মসূচি নজরদারির মুখে, আর বড় শক্তি হিসেবে চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহায়তা মেলেনি। অর্থাৎ ইরান সাময়িকভাবে যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরেছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি শক্তির খেলায় তার অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে জয়-পরাজয় কখনো সরল নয়। একটি সরকার টিকে থাকলেই সে জেতে না। আবার একটি সামরিক অভিযান সব লক্ষ্য পূরণ না করলেই তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় না। প্রকৃত হিসাব করতে হয় ক্ষমতার ভারসাম্য, আঞ্চলিক প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার অবস্থান দিয়ে।
সেই হিসেবে ইরান এখনো বিপজ্জনক, কিন্তু আগের চেয়ে কম সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সবকিছু পায়নি, কিন্তু তারা ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু কূটনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছে নতুন পর্যায়ে। এখন প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন কি এই অর্জন ধরে রাখতে পারবে, নাকি আবার অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফাঁদে পড়ে পরিস্থিতি হাতছাড়া করবে?
ইরান যুদ্ধ জিতেছে—এ কথা তাই খুব সহজ সিদ্ধান্ত। বাস্তবতা আরও জটিল। তেহরান টিকে আছে, কিন্তু ক্ষয়প্রাপ্ত। যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু চাপ কমেনি। আর মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি খেলায় আপাতত ইরানের সামনে পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

