ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে ভ্লাদিমির পুতিনের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল সময়। তার ধারণা ছিল, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ইউক্রেন ক্লান্ত হবে, পশ্চিমা সহায়তা কমে যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাবে, আর রাশিয়া ধীরে ধীরে নিজের লক্ষ্য পূরণের দিকে এগোবে। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত বিজয় না এলেও ক্রেমলিন মনে করেছিল, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শেষ পর্যন্ত মস্কোর পক্ষেই কাজ করবে।
কিন্তু ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসে সেই হিসাব আর আগের মতো সরল নেই। রাশিয়া এখনো বিশাল সামরিক শক্তি, এখনো ইউক্রেনের বড় অংশ দখলে রেখেছে, এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য দেখাচ্ছে। তবু যুদ্ধের গতিপথে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা পুতিনের জন্য অস্বস্তিকর। ইউক্রেন শুধু প্রতিরোধ করছে না; কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভেতরেও যুদ্ধের চাপ ফিরিয়ে দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে আছে তিনটি বিষয়। প্রথমত, যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অগ্রগতি প্রায় থেমে গেছে। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনের মানববিহীন উড়ন্ত অস্ত্রের সক্ষমতা রাশিয়ার ভেতরে নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। তৃতীয়ত, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় মস্কোর ওপর ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধ এখন আর শুধু ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি রাশিয়ার অর্থনীতি, সমাজ, নিরাপত্তা এবং পুতিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
২০২৫ সালে রাশিয়া দখলকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের পরিমাণ সামান্য বাড়াতে পেরেছিল। তখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছায়। এই বৃদ্ধি খুব বড় ছিল না, কিন্তু ক্রেমলিনের জন্য তা রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর মতো ছিল। মস্কো দেখাতে পারত, যুদ্ধ দীর্ঘ হলেও রাশিয়া অন্তত ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
তখন আরেকটি বিষয় পুতিনের পক্ষে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে এমন এক শান্তি চুক্তির দিকে চাপ দিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছিল, যেখানে ইউক্রেনকে আরও ভূখণ্ড হারানোর ঝুঁকি নিতে হতে পারে। ক্রেমলিনের চোখে এটি ছিল বড় সুযোগ। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত জয় না এলেও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে রাশিয়া হয়তো নিজের দখলদারি বৈধতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারবে—এমন আশা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি বদলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে ট্রাম্প এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে ইউক্রেন যুদ্ধ তার মনোযোগের কেন্দ্র থেকে অনেকটাই সরে গেছে। চলতি মাসে জি-৭ সম্মেলনে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহু দূরের এই যুদ্ধের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সরাসরি সম্পর্ক খুব সীমিত। কথাটি ইউক্রেনের জন্য আশ্বাসের নয়, কিন্তু রাশিয়ার জন্যও তা পুরোপুরি সুবিধাজনক নয়। কারণ ট্রাম্প যদি ইউক্রেন প্রশ্নে সক্রিয়ভাবে মস্কোর পক্ষে চাপ তৈরি না করেন, তাহলে পুতিনের প্রত্যাশিত দ্রুত কূটনৈতিক লাভও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনের পর ট্রাম্প প্রশাসন পুতিনের জন্য আরও সুবিধাজনক সমাধান এনে দেবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। ফলে রাশিয়ার কূটনৈতিক ভরসা দুর্বল হয়ে পড়ছে। মস্কো যেভাবে ধরে নিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে পশ্চিমা ঐক্য ভেঙে যাবে এবং ইউক্রেনকে আপস করতে বাধ্য করা সহজ হবে, সে ধারণা এখন প্রশ্নের মুখে।
যুদ্ধক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে। সংখ্যাটি জানুয়ারির তুলনায় সামান্য বেশি হলেও মে মাসের তুলনায় কম। অর্থাৎ রাশিয়া আর ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে—এমন বলা কঠিন। বরং কিছু জায়গায় ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার দখল থেকে এলাকা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে ইউক্রেনের মানববিহীন উড়ন্ত অস্ত্র প্রযুক্তির অগ্রগতি বড় ভূমিকা রাখছে। যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়ার বড় সুবিধা ছিল জনবল ও ভারী সামরিক সরঞ্জাম। কিন্তু ইউক্রেন দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধকৌশলে এগিয়েছে। ব্যাপক উৎপাদন, দ্রুত অভিযোজন এবং সুনির্দিষ্ট আঘাতের সক্ষমতা ইউক্রেনকে এমন শক্তি দিয়েছে, যা রাশিয়ার সংখ্যাগত সুবিধাকে অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে।
মানববিহীন উড়ন্ত অস্ত্র শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সামনের সারিতে নয়, রাশিয়ার গভীর অভ্যন্তরেও প্রভাব ফেলছে। মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো শহরে হামলা চালানোর সক্ষমতা ইউক্রেনকে নতুন ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আঘাত রাশিয়ার সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ আর দূরের কোনো ঘটনা নয়। ইউক্রেনের শহরগুলো বহুদিন ধরে যে ভয়ের মধ্যে ছিল, এখন তার ছায়া রাশিয়ার ভেতরেও পৌঁছাতে শুরু করেছে।
এই বার্তাটি সামরিকের চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র বহুদিন ধরে যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রিত, দূরবর্তী এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অভিযান হিসেবে দেখাতে চেয়েছে। কিন্তু যখন রাশিয়ার ভেতরের শহর, জ্বালানি স্থাপনা এবং সরবরাহপথ হামলার ঝুঁকিতে পড়ে, তখন সেই বয়ান দুর্বল হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে—যুদ্ধ যদি এত সফল হয়, তবে মস্কোর আকাশেই কেন আতঙ্ক?
ক্রেমলিনের অস্বস্তি বোঝা গেছে গত মাসের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজেও। সাধারণত মস্কোর এই অনুষ্ঠান রাশিয়ার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের বড় মঞ্চ। ভারী অস্ত্র, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা—সবকিছু দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছবি আঁকা হয়। কিন্তু এবার অনুষ্ঠান ছিল তুলনামূলক ছোট, আর প্রচলিত সামরিক জাঁকজমকও কম দেখা গেছে। এটি শুধু নিরাপত্তা সতর্কতা নয়; এটি যুদ্ধের ভেতরে রাশিয়ার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরার ইঙ্গিতও হতে পারে।
রাশিয়ার নেতাদের ভয়ের আরেকটি কারণ হলো লক্ষ্যভিত্তিক হামলার আশঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ভেতরে ইরানি নেতাদের হত্যা করেছে—এমন ঘটনার পর রুশ নেতৃত্ব নিশ্চয়ই আরও সতর্ক হয়েছে। যুদ্ধ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সৈন্য নয়, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও নিরাপত্তা ঝুঁকির হিসাব কষতে বাধ্য।
ইউক্রেনের মানববিহীন উড়ন্ত অস্ত্র ঠেকাতে পুতিন রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, এমনকি মস্কোতেও, মুঠোফোনভিত্তিক সংযোগসেবা ব্যাহত করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের আঘাতের সক্ষমতা কমানো। কিন্তু এর ফলে সাধারণ মানুষের বিরক্তি ও অসন্তোষও বাড়ছে। যুদ্ধ যখন মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগ, কাজ, ব্যবসা ও চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রীয় প্রচারের ভাষা আর বাস্তব কষ্টের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়।
তবু হামলা থামেনি। ক্রিমিয়ায় রুশ বাহিনীর সরবরাহপথও আঘাতের মুখে পড়েছে। ক্রিমিয়া রাশিয়ার সামরিক অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। সেখানে সরবরাহে চাপ তৈরি হলে দক্ষিণ ও পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান জটিল হয়ে পড়ে। সামনে রাশিয়া হয়তো নিজের মানববিহীন অস্ত্র সক্ষমতা বাড়াতে পারে, অথবা আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে পারে। কিন্তু এখন অন্তত মনে হচ্ছে, সময় আর একতরফাভাবে পুতিনের পক্ষে কাজ করছে না।
অর্থনীতির দিক থেকেও রাশিয়ার সমস্যা বাড়ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম কিছু সময়ের জন্য বাড়ায় রাশিয়ার রাজস্বে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল। রাশিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে রাশিয়ার তেলের জন্য ক্রেতারা প্রতি ব্যারেলে ৯৫ ডলার এবং মে মাসে ৮৬ ডলার দিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে গড় দাম ছিল ৪৩ ডলার। অর্থাৎ এপ্রিল ও মে মাসে দাম প্রায় দ্বিগুণ ছিল। রাশিয়ার সরকারি বাজেটে যে দাম ধরা হয়েছিল, তা ছিল প্রতি ব্যারেলে ৫৯ ডলার। ফলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি মস্কোকে সাময়িকভাবে কিছুটা শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেয়।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এপ্রিল মাসে রাশিয়ার ২০২৬ সালের মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির পূর্বাভাস ০ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশে নেয়। বাইরে থেকে দেখলে এটি পুতিনের জন্য ইতিবাচক খবর মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই স্বস্তি ছিল অস্থায়ী। কারণ যুদ্ধের ব্যয় এত বড় যে তেলের সাময়িক বাড়তি আয় তা পূরণ করতে পারছে না।
রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। পুতিন ইতিমধ্যে কর বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসার ওপর চাপ আরও বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। সরকার এখন ব্যয়সংকোচনের পরিকল্পনা করছে। রাশিয়ার নিজস্ব সরকারি পূর্বাভাস বলছে, এ বছর মোট দেশজ উৎপাদন মাত্র ০ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। যুদ্ধরত একটি দেশের জন্য এটি আত্মবিশ্বাস জাগানোর মতো চিত্র নয়।
অর্থনৈতিক সংকট শুধু সংখ্যার বিষয় নয়। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে রাষ্ট্রকে সৈন্য, অস্ত্র, ক্ষতিপূরণ, অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং দখলকৃত অঞ্চলের প্রশাসনের জন্য বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং জনশক্তির ক্ষয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে। রাশিয়ার ক্ষেত্রে এসব চাপ একসঙ্গে কাজ করছে।
এই অবস্থায় পুতিনের জন্য যুক্তিযুক্ত পথ হতে পারে আলোচনার টেবিলে ফিরে গিয়ে সংঘাতকে স্থির অবস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করা। অর্থাৎ যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হলেও একটি জমাটবাঁধা পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে বড় আকারের লড়াই থেমে থাকবে এবং রাশিয়া কিছু দখল ধরে রেখে সময় কিনতে পারবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুতিন কি সত্যিই এই বাস্তবতা বুঝছেন?
স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বড় সমস্যা এখানেই। ক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হয়, নেতার কাছে বাস্তবতার সঠিক ছবি পৌঁছানো তত কঠিন হয়। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম না থাকলে, বিরোধী মত দমন করা হলে এবং উপদেষ্টারা খারাপ খবর দিতে ভয় পেলে শাসক ধীরে ধীরে নিজের তৈরি বয়ানের ভেতর বন্দী হয়ে পড়েন। পুতিন বহুবার দাবি করেছেন, ইউক্রেন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। তিনি হয়তো জনমত প্রভাবিত করার জন্য এটি বলেন। কিন্তু বিপদ হলো, তিনি নিজেও আংশিকভাবে সেটি বিশ্বাস করতে শুরু করতে পারেন।
এটাই স্বৈরশাসকের ফাঁদ। যখন শাসকের চারপাশে শুধু অনুগত মানুষ থাকে, তখন বাস্তবতার সঙ্গে তার ধারণার দূরত্ব বাড়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি, অর্থনীতির চাপ, জনগণের অসন্তোষ, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা—এসব তথ্য যদি পরিষ্কারভাবে তার কাছে না পৌঁছায়, তাহলে তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এমন সিদ্ধান্ত, যা দেশকে আরও দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অজেয় যুদ্ধে আটকে রাখে।
রাশিয়া এখনো পরাজিত নয়। ইউক্রেনও সহজ অবস্থানে নেই। যুদ্ধের ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু আগের মতো পুতিনের হাতে সময়, অর্থ, সামরিক গতি এবং কূটনৈতিক সুবিধা একসঙ্গে আছে—এ কথা বলা কঠিন। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অগ্রগতি থেমে যাচ্ছে, ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে আঘাত করছে, অর্থনীতি দুর্বল হচ্ছে, তেলের বাড়তি আয় সাময়িক প্রমাণিত হচ্ছে, আর জনগণের ওপর যুদ্ধের প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউক্রেন এখন রাশিয়ার যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগে মস্কো ভেবেছিল, দীর্ঘ যুদ্ধ ইউক্রেনকে ক্লান্ত করবে। এখন দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ যুদ্ধ রাশিয়াকেও ভেতর থেকে ক্ষয় করছে। পুতিন হয়তো এখনো আলোচনায় বসতে চান না। কিন্তু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় যত বাড়বে, ততই তার সামনে কঠিন প্রশ্ন আসবে—এই যুদ্ধ কি সত্যিই জেতা সম্ভব, নাকি শুধু আরও ক্ষতি বাড়ানো হচ্ছে?
রাশিয়ার পক্ষে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টে গেছে—এমন বলা এখনই অতিরঞ্জন হবে। কিন্তু হাওয়া যে বদলাচ্ছে, তা স্পষ্ট। ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত অভিযোজন, রাশিয়ার অর্থনৈতিক চাপ, ক্রেমলিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পশ্চিমা কূটনীতির অনিশ্চিত হলেও অব্যাহত ভূমিকা—সব মিলিয়ে পুতিনের পুরোনো যুদ্ধহিসাব দুর্বল হয়ে পড়ছে।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু অস্ত্রের ওপর নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও। পুতিন যদি বাস্তবতা মেনে সংঘাত স্থির করার পথে যান, তাহলে রাশিয়া কিছু ক্ষতি সামলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তিনি যদি নিজের প্রচারের ভাষাকেই বাস্তবতা ভেবে যুদ্ধ চালিয়ে যান, তবে রাশিয়া এমন এক ফাঁদে আটকে যেতে পারে, যে যুদ্ধ সে জিততে পারবে না, আবার যার ব্যয়ও বহন করতে পারবে না।
ইউক্রেন যুদ্ধের এই পর্যায়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটাই—রাশিয়া কি এখনও সময়ের ওপর ভরসা করতে পারে, নাকি সময়ই এখন ধীরে ধীরে পুতিনের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করেছে?

