হরমুজ প্রণালী আবারও বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল সমুদ্রপথগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা, নৌপথ নিয়ে মতবিরোধ এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা নতুন করে আরও গভীর হয়েছে একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার পর। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাজারো নাবিকের ওপর, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই জলসীমায় আটকে আছেন।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া এগারো হাজারেরও বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেছে। সংস্থাটির যুক্তি স্পষ্ট—নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া এত বড় উদ্ধার কার্যক্রম চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েকটি জাহাজের নাবিককে এর আগে সরিয়ে নেওয়া হলেও সাম্প্রতিক হামলার পর পুরো পরিকল্পনা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ঘটনাটি শুধু একটি জাহাজে আঘাত হানার বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ, আঞ্চলিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক আইন, বাণিজ্য নিরাপত্তা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনীতির জটিল হিসাব। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্যের বড় একটি অংশ চলাচল করে। তাই এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজার, জাহাজ মালিক, বন্দর, বীমা প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সাম্প্রতিক হামলার শিকার পণ্যবাহী জাহাজটি ওমান উপকূলের কাছাকাছি জলসীমা দিয়ে এগোচ্ছিল। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজটি অজ্ঞাত ক্ষেপণ বস্তুতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি, নাবিকরা নিরাপদে ছিলেন, কিন্তু ঘটনাটি একটি বড় বার্তা দিয়েছে—হরমুজ প্রণালী এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বিশেষ করে যখন কোন পথ দিয়ে জাহাজ চলবে, কার অনুমতি লাগবে, আর কোন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা মানতে হবে—এসব প্রশ্নের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল জটিল হয়ে পড়ে। পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ ও বিধিনিষেধের কারণে অনেক জাহাজ আটকে যায়, বহু নাবিক দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকভাবে বন্দরে ফিরতে পারেননি। কিছু জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটে, যার মধ্যে কয়েকজন নাবিক প্রাণ হারান। নিহতদের অনেকেই ভারতীয় ছিলেন বলে জানা গেছে। ফলে বিষয়টি শুধু রাষ্ট্রীয় কূটনীতি নয়, শ্রমজীবী সমুদ্রমানুষদের জীবন-মরণ প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হওয়ার পর আশা তৈরি হয়েছিল যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। ওই সমঝোতায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিরাপদ চলাচলের কথা বলা হয় এবং পথশুল্ক না নেওয়ার ইঙ্গিতও ছিল। কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, কাগজে থাকা সমঝোতা আর জলসীমার বাস্তব নিরাপত্তা এক জিনিস নয়। কারণ সমঝোতার পরও নৌপথ নির্বাচন নিয়ে বিরোধ কাটেনি।
ওমান ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা এমন একটি বিকল্প নৌপথের প্রস্তাব দেয়, যা ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন জলসীমা আংশিকভাবে এড়িয়ে যায়। ইরান এই প্রস্তাব মানতে রাজি নয়। তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে হলে তার অবস্থান ও অনুমতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। ইরানের মতে, উপকূলবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে তার নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করে অন্যরা আলাদা পথ ঘোষণা করতে পারে না।
এই অবস্থান থেকেই ইরান বারবার বলছে, জাহাজ চলাচলের পথ তাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই নির্ধারণ করতে হবে। ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীও সতর্ক করেছে, অনুমোদিত পথ ছাড়া চলাচল করলে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক জাহাজ হামলার দায় তারা সরাসরি নেয়নি, আবার অস্বীকারও করেনি। এই নীরবতা নিজেই একটি কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখানেই সংকটের মূল জায়গা। যদি কোনো জাহাজ ওমানঘেঁষা পথ ব্যবহার করে, ইরান সেটিকে নিজের নিরাপত্তা স্বার্থের বাইরে নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে। আবার আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর কাছে ওই পথ তুলনামূলক নিরাপদ ও নিরপেক্ষ বলে মনে হচ্ছে। ফলে একই সমুদ্রপথকে দুই পক্ষ দুইভাবে ব্যাখ্যা করছে। এক পক্ষের কাছে এটি নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা, অন্য পক্ষের কাছে এটি কর্তৃত্বকে পাশ কাটানোর চেষ্টা।
জাতিসংঘের উদ্ধার পরিকল্পনা স্থগিতের কারণও এখানেই। হাজার হাজার নাবিককে সরিয়ে আনতে হলে জাহাজ, নৌযান, নিরাপত্তা সমন্বয়, উপকূলীয় রাষ্ট্রের অনুমতি এবং চলাচলের নির্দিষ্ট পথ সবকিছু পরিষ্কার থাকতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর বোঝা গেল, এই নিশ্চয়তা এখনো নেই। যে জলসীমায় পণ্যবাহী জাহাজ আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে, সেখানে বড় উদ্ধার কার্যক্রম চালানো মানে আরও মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
এই সংকটের মানবিক দিকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালী নিয়ে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের শক্তি, নিরাপত্তা ও প্রভাবের হিসাব করছে, কিন্তু আটকে পড়া নাবিকদের জীবন থমকে আছে। তারা কেউ যুদ্ধের পক্ষ নয়, কেউ কূটনৈতিক আলোচনার অংশ নয়, তবু সংঘাতের বোঝা বহন করছেন। পরিবার থেকে দূরে, অনিশ্চয়তার মধ্যে, ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমায় তাদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনে আঘাত করে, এই ঘটনা তার স্পষ্ট উদাহরণ।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব দ্রুত বিশ্ববাজারে পড়তে পারে। জাহাজ চলাচল কমে গেলে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হয়, বীমা ব্যয় বাড়ে, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যেসব দেশ আমদানি-নির্ভর, তাদের জন্য এই ধরনের অস্থিরতা সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিছু জাহাজ এখনও প্রণালী অতিক্রম করছে। কিন্তু চলাচলের সংখ্যা আগের স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় কম। আগে প্রতিদিন অনেক বেশি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করলেও এখন সতর্কতা, পথ নির্বাচন, অনুমতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে চলাচল ধীর। এর অর্থ হলো বাণিজ্য চলছে, কিন্তু ভরসা ফিরেনি।
ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়, এটি কৌশলগত প্রভাবের বড় হাতিয়ার। এই পথ দিয়ে চলাচলের ওপর প্রভাব রাখার মাধ্যমে তেহরান আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজের গুরুত্ব বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েনের সময়ে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের কাছে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কার্যকর উপায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলো চায়, এই পথ যেন কোনো একক রাষ্ট্রের চাপের আওতায় না থাকে।
এ কারণে সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—হরমুজ প্রণালী কি আগের মতো মুক্ত ও তুলনামূলক স্থিতিশীল বাণিজ্যপথে ফিরবে, নাকি নতুন নিয়ম, নতুন মাশুল এবং নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে চলবে? ইরানের বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, তারা আগের অবস্থায় ফিরতে আগ্রহী নয়। তারা চায়, যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় তাদের ভূমিকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হোক। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নিতে চাইবে না, যা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে রাজনৈতিক অনুমতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তোলে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বাস্তববাদী হলেও তা উদ্বেগ কমায় না। উদ্ধার স্থগিত মানে নাবিকদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে। আবার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া উদ্ধার চালালে নতুন বিপদ তৈরি হতে পারে। তাই এখন প্রয়োজন দ্রুত কূটনৈতিক সমন্বয়, স্বচ্ছ নৌপথ নির্ধারণ এবং সব পক্ষের কাছ থেকে লিখিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
হরমুজ প্রণালীর বর্তমান সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমুদ্রপথ শুধু বাণিজ্যের রাস্তা নয়; এটি ক্ষমতা, নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার মিলনস্থল। একটি জাহাজে আঘাত মানে শুধু ধাতব কাঠামোর ক্ষতি নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশ্ববাজারের আতঙ্ক, রাষ্ট্রগুলোর সন্দেহ, নাবিকদের জীবন এবং আঞ্চলিক শান্তির ভবিষ্যৎ।
এখন সব পক্ষের সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে আছে শক্তি প্রদর্শন, পাল্টাপাল্টি সতর্কতা এবং অনিশ্চয়তার দীর্ঘায়ন। অন্যদিকে আছে আলোচনার মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে উপকূলীয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগও বিবেচনায় থাকবে, আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নাবিকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে হরমুজ প্রণালী সামনের দিনগুলোতে স্থিতিশীলতার পথে যাবে, নাকি আরও বড় সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হবে।

