মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন পুরোনো ইতিহাসও নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসছে। এক শতাব্দীর বেশি সময় আগে যে হেজাজ রেলপথ সাম্রাজ্য, ধর্মীয় যাত্রা, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সংযোগের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই রেলপথ আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ৯ জুন তুরস্ক ও সৌদি আরব ঐতিহাসিক হেজাজ রেলপথ পুনরুদ্ধার নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবহন প্রকল্পের ঘোষণা নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক সংযোগ, অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনাও সামনে আনছে।
হেজাজ রেলপথের ইতিহাস শুরু হয়েছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ যুগে। ১৮৯০-এর দশকের শেষ দিকে উসমানীয় সুলতান আব্দুলহামিদ দ্বিতীয় তাঁর মন্ত্রিসভার সামনে এই রেলপথ নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তখন অনেকেই এই পরিকল্পনাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর আগ্রহ এতটাই প্রবল যে এমন একটি বড় যোগাযোগ প্রকল্প তাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। কিন্তু আব্দুলহামিদ দ্বিতীয় এই বিরোধিতায় থেমে যাননি। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য এবং সাম্রাজ্যের ভেতর যোগাযোগ শক্তিশালী করার ভাবনা থেকেই তিনি প্রকল্পটি এগিয়ে নেন।
২ মে ১৯০০ সালে দামেস্ক থেকে মদিনা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়া হয়। মদিনা ইসলাম ধর্মের অন্যতম পবিত্র নগরী হওয়ায় এই প্রকল্পের ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল গভীর। ১৯০৮ সালের মধ্যে মূল রেললাইন সম্পন্ন হয়। পরে হাইফা-দামেস্ক রেলপথসহ আরও কিছু শাখা যুক্ত হয়। ১৯১৭ সালের মধ্যে বর্তমান সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বিভিন্ন অংশ মিলিয়ে রেলপথটির মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ১৭৫০ কিলোমিটার।
এই রেলপথের সবচেয়ে আলোচিত উদ্দেশ্য ছিল হজযাত্রা সহজ করা। আগে যে যাত্রায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ সময় লাগত, রেলপথ চালু হলে তা কয়েক দিনে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু হেজাজ রেলপথ শুধু হজযাত্রীদের সুবিধার জন্য তৈরি হয়নি। এর পেছনে ছিল আরও বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত চিন্তা। উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল—বলকান, আনাতোলিয়া ও আরব প্রদেশগুলোকে এক অবকাঠামোগত সুতায় বাঁধার চেষ্টা ছিল এই প্রকল্পের মূল শক্তি।
আজ, এক শতাব্দীর বেশি সময় পর, সেই একই সংযোগের ধারণা নতুন প্রেক্ষাপটে আবার গুরুত্ব পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, সীমান্ত বিরোধ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদেশি প্রভাবের টানাপোড়েনে আটকে আছে। এমন সময়ে হেজাজ রেলপথ পুনরুজ্জীবনের আলোচনা শুধু রেললাইন বসানোর বিষয় নয়; এটি একটি নতুন আঞ্চলিক মানসিকতার ইঙ্গিতও হতে পারে।
৯ জুন তুরস্ক ও সৌদি আরবের সমঝোতার আগে এপ্রিল মাসে তুরস্ক, সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় পরিবহন চুক্তি হয়। তারও আগে সেপ্টেম্বর মাসে এই তিন দেশ ঐতিহাসিক রুটটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘোষণা নয়; বরং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর যোগাযোগ কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর দামেস্কে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। কারণ সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সেতু হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সে ভূমিকা কার্যকরভাবে নিতে পারেনি। এখন যদি তুরস্ক, সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরব একটি বড় রেলপথ প্রকল্পে একসঙ্গে এগোতে পারে, তাহলে তা শুধু বাণিজ্য নয়, আস্থার নতুন কাঠামোও তৈরি করতে পারে।
হেজাজ রেলপথের পুনরুজ্জীবনকে তাই কয়েকটি স্তরে দেখা দরকার। প্রথমত, এটি অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়াতে পারে। রেলপথ বাণিজ্যকে দ্রুত, সস্তা ও স্থলভিত্তিক বিকল্প দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে পারে, যার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। তৃতীয়ত, এটি রাজনৈতিকভাবে তুরস্ক ও আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে। চতুর্থত, নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। কারণ একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে চলা রেলপথ চালু রাখতে হলে বিস্তৃত নিরাপত্তা সমন্বয় প্রয়োজন।
এখানেই প্রকল্পটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি রেলপথ তখনই কার্যকর হয়, যখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সীমান্ত নিরাপত্তা, যাত্রী চলাচল, পণ্য পরিবহন, কাস্টমস, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ হেজাজ রেলপথ শুধু রেললাইন নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পরীক্ষাও হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তুরস্কের আরেক বড় প্রকল্প—ডেভেলপমেন্ট রোড। এই প্রকল্পের মূল্য ধরা হয়েছে ১৭ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার। এতে উচ্চগতির রেললাইন, বহু লেনের মহাসড়ক এবং শিল্পকেন্দ্রের পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হলো ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বসরার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলকে ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। যদি হেজাজ রেলপথ এই ধরনের প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে যুক্ত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম সংযোগের নতুন মানচিত্র তৈরি হতে পারে।
আরও বড় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, হেজাজ রেলপথ জাঙ্গেজুর করিডরের সঙ্গেও সম্ভাব্যভাবে যুক্ত হতে পারে। এই ককেশীয় রুট আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে তুরস্ককে কাস্পিয়ান সাগর ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা বহন করে। ফলে হেজাজ রেলপথ শুধু সৌদি আরব, জর্ডান, সিরিয়া ও তুরস্কের প্রকল্প হয়ে থাকবে না; এটি চাইলে ভবিষ্যতে উপসাগর, আনাতোলিয়া, ককেশাস, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে বড় যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা উপসাগরীয় দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। এই প্রণালী যদি কোনো সংঘাত, অবরোধ বা সামরিক উত্তেজনার কারণে ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জ্বালানি রপ্তানি, খাদ্য আমদানি এবং পর্যটনভিত্তিক অর্থনীতির জন্য নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে হেজাজ রেলপথ ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প বা অন্তত পরিপূরক স্থলপথ হিসেবে গুরুত্ব পেতে পারে। যদি এই রেলপথ জর্ডানের লোহিত সাগর বন্দর আকাবা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয় এবং সৌদি রাজধানী রিয়াদের মধ্য দিয়ে ওমানের আরব সাগর উপকূলের দিকে সংযোগ তৈরি করতে পারে, তাহলে ইরানের হরমুজ প্রণালীকেন্দ্রিক কৌশলগত প্রভাব কিছুটা কমে যেতে পারে। অর্থাৎ রেলপথটি শুধু যাত্রী বা পণ্য পরিবহনের পথ নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটও এই আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। সংঘাতের সময় ইরান কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলটির নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তুরস্কের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী হয়েছে। তুরস্ক প্রতিরক্ষা পণ্যের বড় রপ্তানিকারক এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর দেশ। ফলে আঙ্কারার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা রিয়াদের জন্য নিরাপত্তা ও ভারসাম্য উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
একই সঙ্গে মিসর, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যে চারপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতার ধারা গড়ে উঠছে, হেজাজ রেলপথের মতো প্রকল্প সেটিকেও নতুন মাত্রা দিতে পারে। নিরাপত্তা সহযোগিতা শুধু সামরিক মহড়া বা প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বড় অবকাঠামো প্রকল্পও অনেক সময় রাজনৈতিক আস্থা এবং কৌশলগত সমন্বয়ের ভিত্তি তৈরি করে।
ইসরায়েলকে ঘিরেও এই প্রকল্পের ভূরাজনৈতিক আলোচনার একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে। ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজা, লেবানন, ইয়েমেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরান পর্যন্ত সংঘাতের বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়লে তা ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
কারণ ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন যদি তুরস্ক, সৌদি আরব, সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্যে নতুন ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, তাহলে আঞ্চলিক হিসাব পাল্টে যেতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। অন্যদিকে, রিয়াদ ক্রমেই আঙ্কারাকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসন মোকাবিলায় সৌদি আরব শুধু প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নয়, অর্থনৈতিক সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমেও ভারসাম্য তৈরির পথ খুঁজতে পারে।
এই জায়গায় হেজাজ রেলপথের প্রতীকী গুরুত্বও কম নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লরেন্স অব আরবিয়ার নেতৃত্বে উসমানীয় ট্রেনের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। সেই হামলাগুলো ঐতিহাসিক হেজাজ রেলপথকে দুর্বল করে এবং শেষ পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে রেলপথটির কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। এখন যখন একই রেলপথ পুনরুজ্জীবনের কথা উঠছে, তখন ইতিহাসের সেই স্মৃতিও নতুন রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসছে।
তুরস্কের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে সরব। একই সঙ্গে তুরস্ক আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। সম্প্রতি তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী ওমের বোলাত এবং সিরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নিদাল আল-শারের বৈঠকে ঐতিহাসিক রেলপথ পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি আলোচিত হয়। সেখানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংহতির মাধ্যমে সমৃদ্ধি বাড়ানোর কথা সামনে আসে।
হেজাজ রেলপথ আরেকটি বড় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ প্রকল্পকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে। সেটি হলো ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ করিডর, যাকে সংক্ষেপে আইমেক বলা হয়। এই পশ্চিমা সমর্থিত প্রকল্পের লক্ষ্য ভারতকে উপসাগরীয় অঞ্চল, ইসরায়েল ও ভূমধ্যসাগরের মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করা। কিন্তু যদি হেজাজ রেলপথ এবং তুরস্ক-ইরাকের ডেভেলপমেন্ট রোড বাস্তব অগ্রগতি পায়, তাহলে আইমেকের কৌশলগত গুরুত্ব কমে যেতে পারে। কারণ নতুন রুটগুলো ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে নয়, বরং তুরস্ক ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সমন্বয়ের ওপর দাঁড়াবে।
এতে ইসরায়েলের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন। ইসরায়েল যেখানে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আশা করছিল, সেখানে আঙ্কারা, দামেস্ক, আম্মান ও রিয়াদের নতুন সমীকরণ ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করছে। বিশেষ করে সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই সমীকরণকে আরও সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ এখনো নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। সিরিয়ার অবকাঠামো যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। জর্ডান, সৌদি আরব ও তুরস্কের স্বার্থ সব ক্ষেত্রে এক নয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত পুনর্গঠন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নে দীর্ঘ আলোচনা দরকার হবে। তার ওপর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো এই প্রকল্পকে সহজভাবে নাও নিতে পারে।
তবু হেজাজ রেলপথের পুনরুজ্জীবন একটি বড় বার্তা দিচ্ছে। সেটি হলো—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ধীরে ধীরে সংঘাতের বাইরে গিয়ে সংযোগ, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক নির্ভরতার নতুন ভাষা খুঁজছে। এই ভাষা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে একসময় যে রেলপথ মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় যাত্রা সহজ করার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই রেলপথ এবার মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনেরও অংশ হতে পারে।
সব মিলিয়ে হেজাজ রেলপথ এখন শুধু ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন নয়। এটি একদিকে আব্দুলহামিদ দ্বিতীয়ের যুগের অসমাপ্ত কৌশলগত কল্পনার পুনরাগমন, অন্যদিকে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন। রেললাইন বসানো যতটা প্রকৌশলগত কাজ, তার চেয়েও বেশি এটি আস্থা, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির সমন্বিত পরীক্ষা। এই পরীক্ষা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে নতুন সংযোগরেখা তৈরি হবে—যেখানে পুরোনো পথই হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের নতুন শক্তি।

