দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কাতারে আটকে থাকা ইরানের বিপুল অর্থের একটি বড় অংশও ছাড় করা হবে।
বার্তা সংস্থা মেহেরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৯ জুন) কোম শহর সফরের সময় গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ শোবেইরি জানজানির সঙ্গে বৈঠকে এ ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।
প্রেসিডেন্ট জানান, কাতারে বর্তমানে ইরানের মোট ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার জব্দ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৬০০ কোটি ডলার ইরানের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। বাকি অর্থও ধাপে ধাপে ছাড় করানোর প্রক্রিয়া চলছে।
তার ভাষায়, এই অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আলোচনা এবং ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অংশ।
পেজেশকিয়ান সাম্প্রতিক সমঝোতাকে ইরানের জনগণের জন্য একটি ‘বড় বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কঠিন সময়ে দেশের জনগণ, সশস্ত্র বাহিনী এবং সরকার ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। এই ঐক্যই শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইরানের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে বলে তার দাবি।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের সময় দেশের সর্বোচ্চ নেতা, মন্ত্রী, সামরিক কমান্ডার, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এমনকি স্কুলশিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হলেও জনগণের মনোবল ভাঙেনি।
ইরানের প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্মিলিতভাবে ইরানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করা সম্ভব হবে।
তবে জনগণের প্রতিরোধ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের কারণে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল দেশের জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং ঘোষিত নীতির বাইরে যাবে না।
ইরানের প্রেসিডেন্টের দাবি, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলকে এই সমঝোতা মেনে নিতে বাধ্য করেছে। তবে ইসরায়েল এবং কয়েকটি বিরোধী গোষ্ঠী এখনো চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের বিরোধিতা করছে।
তার মতে, চুক্তি কার্যকর করতে হলে উভয় পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দেওয়া জরুরি।
পেজেশকিয়ান জানান, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচিতে ঋণসুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা লাঘব করা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ৬০০ কোটি ডলার ফেরত পাওয়া শুধু ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করবে না, বরং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের রপ্তানি বাড়তে পারে, যা দেশটির অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিতে সক্ষম। তবে এসব প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং সমঝোতার ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান পর্যবেক্ষণের বিষয়।

