যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া সাম্প্রতিক সমঝোতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ একে কূটনৈতিক সাফল্য বলছেন, কেউ আবার এটিকে দুর্বল চুক্তি হিসেবে দেখছেন। তবে বাস্তবতা সম্ভবত আরও জটিল। এই সমঝোতা কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি নয়। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি হিসেবেও এটিকে দেখা কঠিন। বরং এটি এমন এক সাময়িক বিরতি, যেখানে দুই পক্ষই জানে, তাদের মূল বিরোধ মেটেনি; শুধু সংঘাতের সময়সূচি কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক আদলফো ফ্রাঙ্কো যুক্তি দিয়েছেন, এই সমঝোতাকে সরলভাবে জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখা ভুল হবে। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে দুর্বলতার জায়গা থেকে নয়, বরং ইরানি শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়েই।
অনেক সমালোচক বলছেন, ট্রাম্প যেন আলোচনায় বাধ্য হয়েছেন এবং ইরান তাঁর কাছ থেকে সুবিধাজনক একটি সমঝোতা আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা পুরো ছবিটা দেখায় না। ওয়াশিংটন ভালো করেই জানে, তেহরান এমন কোনো অঙ্গীকার সহজে মানবে না, যা তার পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আঞ্চলিক প্রভাব বা সামরিক কৌশলকে সত্যিকার অর্থে সীমাবদ্ধ করে। অন্যদিকে তেহরানও জানে, যুক্তরাষ্ট্র তাকে বিশ্বাস করে না। ফলে এই সমঝোতার কেন্দ্রে আস্থা নেই, আছে সময় কেনা।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষের কেউই সম্ভবত মনে করছে না যে এই সমঝোতা স্থায়ী শান্তির পথ খুলে দেবে। ইরান অর্থনৈতিক চাপ কমাতে চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক সংঘাত এড়িয়ে নিজের কৌশলগত অবস্থান মজবুত করতে চায়। অর্থাৎ এই সমঝোতা শান্তির প্রতিশ্রুতি নয়; এটি এক ধরনের হিসাবি বিরতি।
ইরানের অতীত আচরণ এই সন্দেহকে আরও জোরালো করে। তেহরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, তারা চাপের মুখে আলোচনায় বসে, প্রয়োজন হলে অঙ্গীকার করে, কিন্তু চাপ কমে গেলে আবার আগের পথে ফিরে যায়। এই ধারা কোনো একবারের ঘটনা নয়; বরং বহু বছরের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি। ইরান যখন আন্তর্জাতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক হুমকির মুখে পড়ে, তখন আপাত নমনীয়তা দেখায়। কিন্তু পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হলেই আবার নিজের কৌশলগত লক্ষ্য এগিয়ে নিতে শুরু করে।
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি এই বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। সেই চুক্তিকে একসময় বহুপাক্ষিক কূটনীতির বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু সমালোচকদের মতে, বাস্তবে এটি ইরানকে সময়, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং কৌশলগত শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। তাদের বক্তব্য, চুক্তিটি ইরানের আচরণ বদলায়নি; বরং তেহরান সেই সুযোগ ব্যবহার করেছে নিজেদের সম্পদ গুছিয়ে নিতে, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে ধরে রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এগিয়ে নিতে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন অতীতে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপের নীতি গ্রহণ করেছিল। সেই নীতির মূল ধারণা ছিল, ইরানের মতো রাষ্ট্রকে শুধু কূটনৈতিক আশ্বাস দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাকে এমন চাপের মধ্যে রাখতে হয়, যেখানে বাধ্যতামূলক আনুগত্য ছাড়া তার সামনে কার্যকর বিকল্প কমে যায়।
নতুন সমঝোতাকে তাই ইরানের পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। তেহরানের মৌলিক হিসাব আগের মতোই আছে: শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা, আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখা এবং কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানো। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী তারা কখনও কঠোর, কখনও নমনীয় ভঙ্গি নেয়। কিন্তু লক্ষ্য একই থাকে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের অনেকে মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা মূলত সীমিত মেয়াদের একটি কৌশলগত ব্যবস্থাপনা, স্থায়ী সমাধান নয়।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এই অবিশ্বাসের কেন্দ্রে। পরমাণু বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য হিসেবে ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে স্বচ্ছ সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বহুবার তাদের বিরুদ্ধে পরিদর্শন বাধাগ্রস্ত করা, গোপন সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি করা, প্রমাণ নষ্ট করা এবং আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে সমালোচকরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেন না। তাঁদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন ওঠে: যদি ইরানের উদ্দেশ্য কেবল বেসামরিক পরমাণু শক্তি হয়, তাহলে এত ব্যয়বহুল ও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশীয় সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কেন? জ্বালানি হিসেবে পরমাণু ইন্ধন অন্য দেশ থেকেও কেনা সম্ভব, রাশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে তা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া যায়। কিন্তু ইরান নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ পথ বেছে নিয়েছে। সমালোচকদের চোখে এর অর্থ হলো, সমৃদ্ধকরণ শুধু উপায় নয়; সেটিই আসল লক্ষ্য।
এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের শাসকগোষ্ঠী পরমাণু অস্ত্র সক্ষমতার দিকে অগ্রসর হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকার, ভাষা বা কূটনৈতিক ভঙ্গি বদলালেও সেই লক্ষ্য বদলায়নি। নিষেধাজ্ঞা ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করেছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে দুর্বল করেছে, দারিদ্র্য বাড়িয়েছে এবং ওষুধ ও সুযোগ-সুবিধার সংকট তৈরি করেছে। কিন্তু এসব কষ্টও শাসকগোষ্ঠীকে তাদের মূল কৌশল থেকে সরাতে পারেনি।
ইরান চাইলে অন্য পথ নিতে পারত। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হওয়া, নিষেধাজ্ঞা কমানো এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল না। এর বিনিময়ে তাকে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ, আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন বন্ধ এবং সশস্ত্র মিত্রগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করতে হতো। কিন্তু তেহরান বারবার সেই পথ এড়িয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সমঝোতাকে দুর্বলতার চিহ্ন হিসেবে দেখা তাড়াহুড়ো হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল সম্ভবত ভিন্ন। তারা জানে, ইরান সব অঙ্গীকার আন্তরিকভাবে মানবে না। তাই এই সমঝোতার মূল্য তাদের কাছে অন্য জায়গায়। এটি সময় দিচ্ছে, চাপের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুযোগ দিচ্ছে এবং তাৎক্ষণিক সংঘাত এড়ানোর পথ দিচ্ছে।
এখানে একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে। যাকে আপনি বিশ্বাসই করেন না, সে প্রতিশ্রুতি ভাঙলে আপনি সত্যিকার অর্থে বিস্মিত হন না। তাই সমঝোতাটি যদি ভেঙেও যায়, ওয়াশিংটনের কাছে তা অপ্রত্যাশিত হওয়ার কথা নয়। বরং সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্র তার পরবর্তী পদক্ষেপ সাজাতে পারে।
ইরানের প্রয়োজন এখন অর্থনৈতিক স্বস্তি। অভ্যন্তরীণ চাপ, অর্থনৈতিক ক্লান্তি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সংকট তেহরানকে সময় কিনতে বাধ্য করছে। ট্রাম্পের মেয়াদে প্রায় আড়াই বছর বাকি আছে—এই হিসাবও ইরানের কৌশলে ভূমিকা রাখছে। তেহরানের দৃষ্টিতে, এই সময় পার করে টিকে থাকাই বড় সাফল্য হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব আলাদা। হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা ওয়াশিংটনের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে এবং তার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে। তাই যুক্তরাষ্ট্র এমন সংঘাত চায় না, যা অপ্রস্তুত অবস্থায় জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে দেবে।
এর পাশাপাশি সামরিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র সময় চাইতে পারে। সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে যে সামরিক মজুত কমেছে, তা পূরণ করা, কৌশলগত প্রস্তুতি বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের বিকল্প খোলা রাখা—এসবের জন্য একটি বিরতি প্রয়োজন হতে পারে। এই দৃষ্টিতে সমঝোতা ছাড় নয়; বরং প্রস্তুতির অংশ।
ট্রাম্পের ইরান নীতির কেন্দ্রে সবসময় ছিল চাপ প্রয়োগ। তাঁর অবস্থান হলো, ইরানকে শুধু আলোচনার টেবিলে বসালেই হবে না, তার সামনে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কৌশলগত হুমকি হিসেবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান সমঝোতা সেই নীতির অবসান নয়। বরং এটি এমন একটি পর্যায়, যেখানে সরাসরি সংঘাতের আগে ওয়াশিংটন নিজেকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিতে চাইছে।
ইরানের সামনে তাই মূল প্রশ্ন হলো, তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ়তা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করে হারাতে পারবে? অতীতে তেহরান এই ধরনের বাজি ধরেছে। কখনও সময় পেয়েছে, কখনও কঠোর চাপের মুখে পড়েছে। এবারও তাদের হিসাব একই হতে পারে: সময় নাও, অর্থনৈতিক শ্বাস নাও, রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলানোর অপেক্ষা করো।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও এখানে জটিল। অনেক দেশ চায় ইরানের পরমাণু অগ্রগতি থামুক, কিন্তু সরাসরি কঠোর পদক্ষেপ নিতে তারা অনাগ্রহী। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করে, আবার যুক্তরাষ্ট্র নিষ্ক্রিয় থাকলেও উদ্বেগ জানায়। এই দ্বৈত অবস্থান ট্রাম্প ভালোভাবেই বোঝেন। তাঁর জোটনীতি মূলত এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে—মিত্ররা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ওপর নির্ভর করবে না, বরং নিজেদের অংশের দায়ও বহন করবে।
সব মিলিয়ে এই সমঝোতা ইরান সমস্যার সমাধান করবে না। সম্ভবত সেটি করার উদ্দেশ্যেও এটি তৈরি হয়নি। বরং এটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। সময় শেষ হলে, বা তেহরান মনে করলে যে সমঝোতা তার প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করেছে, তখন পরমাণু কর্মসূচি আবার দ্রুত এগোতে পারে, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলো নতুন অর্থ ও অস্ত্র পেতে পারে এবং হরমুজ প্রণালী আবার উত্তেজনার কেন্দ্রে ফিরে আসতে পারে।
এই সম্ভাবনাকে শুধু আশঙ্কা বলা কঠিন। ইরানের অতীত আচরণ বিবেচনায় এটি অনেকের কাছে প্রায় নিশ্চিত পরিণতি বলে মনে হয়। তাই আসল প্রশ্ন হলো, সেই সময় এলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছুক দেশগুলো কতটা প্রস্তুত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে তাই শান্তির নতুন সকাল হিসেবে দেখা যেমন সরলীকরণ, তেমনি একে সরাসরি আত্মসমর্পণ বলাও অতিরঞ্জন। এটি বরং এমন এক কূটনৈতিক বিরতি, যেখানে দুই পক্ষই নিজেদের লক্ষ্য বদলায়নি। শুধু সংঘাতের গতি সাময়িকভাবে কমিয়েছে।
ওয়াশিংটন সময় নিচ্ছে প্রস্তুতির জন্য। তেহরান সময় নিচ্ছে টিকে থাকার জন্য। আর বিশ্ব অপেক্ষা করছে—এই বিরতি সত্যিই উত্তেজনা কমাবে, নাকি বড় সংঘাতের আগে এক ক্ষণিক নীরবতা হয়ে থাকবে।

