যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন এমন এক সময় চলছে, যখন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত শুধু আইন ব্যাখ্যা করছে না, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করছে। রাষ্ট্রপতি, আইনসভা, নির্বাচনব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার, অভিবাসননীতি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা—সবকিছুর কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছে নয়জন বিচারকের সিদ্ধান্ত।
সাধারণ মানুষের চোখে আদালত সাধারণত এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা সংবিধান ও আইনের আলোকে বিরোধ নিষ্পত্তি করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতায় এই আদালতকে অনেক সময় একটি রাজনৈতিক শক্তির মতো দেখাচ্ছে। কারণ, যে প্রশ্নগুলোর সমাধান নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের করার কথা, সেগুলোই এখন বিচারকদের টেবিলে গিয়ে জমা হচ্ছে।
এর বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজন। দেশটি এখন মতাদর্শগতভাবে এতটাই বিভক্ত যে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে সমঝোতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আইনসভা কার্যকরভাবে আইন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অভিবাসন, ভোটাধিকার, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, সরকারি সংস্থার স্বাধীনতা এবং সামাজিক অধিকারসংক্রান্ত বিতর্ক আদালতের কাছে চলে যাচ্ছে। আদালত তখন শুধু মামলার রায় দিচ্ছে না, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সীমারেখাও টেনে দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ এই পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। তিনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিধি বারবার পরীক্ষা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত আইনি সীমাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আদালত কখনো তাঁকে থামিয়েছে, আবার কখনো তাঁর হাতে আরও ক্ষমতা দিয়েছে। এই ওঠানামার মধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার লড়াই এখন শুধু নির্বাচনের মাঠে নয়, আদালতের ভেতরেও চলছে। মূল সংবাদে এই প্রবণতাকেই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের বাড়তে থাকা রাজনৈতিক প্রভাব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে আদালত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি স্বাধীন বলে বিবেচিত কিছু কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থার প্রধানদের অপসারণ করতে পারবেন। এর ফলে বহু দশক ধরে চলে আসা একটি আইনি ধারণা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগে এসব সংস্থাকে রাজনৈতিক চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, বড় ব্যবসা, শ্রমনীতি, জনস্বার্থ এবং বাজার তদারকির মতো বিষয়ে সিদ্ধান্ত যেন সরাসরি দলীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে চলে না যায়। কিন্তু নতুন রায়ের ফলে এসব সংস্থার ওপর রাষ্ট্রপতির প্রভাব বাড়তে পারে।
এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন সরকারি সংস্থাগুলো বহুদিন ধরে ক্ষমতার ভারসাম্যের অংশ হিসেবে কাজ করেছে। তাদের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপতির তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ইচ্ছা থেকে কিছুটা দূরে থেকে জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এখন যদি রাষ্ট্রপতি এসব সংস্থার নেতৃত্ব সহজে বদলে দিতে পারেন, তাহলে সংস্থাগুলো ভবিষ্যতে আরও রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে। এতে বড় ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক অধিকার, ভোক্তা সুরক্ষা এবং জননিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে।
ট্রাম্প এই রায়কে নিজের জন্য বড় জয় হিসেবে দেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে এটি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের অংশ। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এটি ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও, সব প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে একক রাজনৈতিক ইচ্ছার অধীন করে দিলে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। বিশেষ করে এমন সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, যাদের কাজই হলো শক্তিশালী কর্পোরেট স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে বর্তমানে রক্ষণশীল বিচারকদের প্রভাব বেশি। তাঁদের অনেকের আইনি দর্শনে রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক ক্ষমতাকে শক্তিশালী করার প্রবণতা রয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী, নির্বাহী শাখার কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির অধীন থাকবেন। সমর্থকদের মতে, এতে জবাবদিহি পরিষ্কার হয়। বিরোধীদের মতে, এতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয় এবং রাষ্ট্রপতির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা জমা হয়।
তবে আদালত সবসময় ট্রাম্পের পক্ষে যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে আদালত তাঁর ক্ষমতার সীমাও নির্ধারণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে শুল্কসংক্রান্ত একটি রায়ের কথা বলা যায়। আদালত রায় দিয়েছে যে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপ করতে পারেন না। এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আঘাত করেছে।
ভোটসংক্রান্ত আরেকটি রায়ে আদালত ট্রাম্পপন্থী অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের ডাকযোগে ভোটগণনা নিয়ে বিরোধে আদালত সিদ্ধান্ত দেয়, নির্বাচনের দিন ডাকমোহরযুক্ত কিছু ভোট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছালে তা গণনা করা যেতে পারে। এই রায় ভোটাধিকারপন্থীদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হয়েছে, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে ভোট নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই দুই ধরনের রায় একসঙ্গে দেখলে একটি জটিল ছবি সামনে আসে। আদালত একদিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে সীমাবদ্ধও করছে। ফলে আদালতকে সরলভাবে কোনো এক পক্ষের রাজনৈতিক যন্ত্র বলা কঠিন। তবে এটাও সত্য যে আদালতের সিদ্ধান্তগুলো এখন দেশটির ক্ষমতার কাঠামোকে গভীরভাবে বদলে দিচ্ছে।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে: কেন এত বড় বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রশ্ন আদালতের কাছে যাচ্ছে? এর উত্তর অনেকটাই আইনসভার ব্যর্থতায় লুকিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না। অভিবাসন সংস্কার, ভোটাধিকার, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সামাজিক নীতির মতো বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলছে। ফলে আইন পরিষ্কার না হলে, আদালতই শেষ ব্যাখ্যাকারী হয়ে দাঁড়ায়।
অভিবাসন এর একটি বড় উদাহরণ। যদি আইনসভা সময়মতো সমন্বিত অভিবাসন আইন পাস করতে পারত, তাহলে অনেক মানবিক ও প্রশাসনিক বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই সমাধান হতে পারত। কিন্তু রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে তা হয়নি। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বা সংকটাপন্ন দেশ থেকে আসা মানুষদের সাময়িক সুরক্ষা, নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং সীমান্তনীতি—সবই আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় এবং উদ্বেগজনক। প্রয়োজনীয়, কারণ আদালত সংবিধানের রক্ষক। যখন রাষ্ট্রপতি বা আইনসভা সীমা অতিক্রম করে, তখন আদালতের হস্তক্ষেপ দরকার। কিন্তু উদ্বেগজনক, কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি বারবার সিদ্ধান্তহীন থাকে, তাহলে অনির্বাচিত বিচারকদের ওপর অতিরিক্ত রাজনৈতিক দায়িত্ব এসে পড়ে। এতে জনগণের সরাসরি প্রতিনিধিত্বের জায়গা সংকুচিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আদালত এর আগেও বড় রাজনৈতিক ঝড়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিয়েছে। দাসপ্রথা, নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক সংস্কার, সমলিঙ্গের বিবাহ এবং গর্ভপাতের অধিকার—এসব বিষয়ে আদালতের রায় দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র বদলে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের পার্থক্য হলো, আদালত এখন প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে পড়ছে।
আরেকটি বিষয় হলো আদালতের প্রতি জনআস্থার প্রশ্ন। যখন রায়গুলো আদর্শিক বিভাজন অনুযায়ী দেখা হয়, তখন সাধারণ মানুষ আদালতকে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কম এবং রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বেশি দেখতে শুরু করে। বিচারকদের মতবিরোধ, কঠোর ভিন্নমত এবং রায় প্রকাশের পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে আদালতের ভাবমূর্তি আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
ট্রাম্পের আচরণও আদালতকে এই রাজনৈতিক ঘূর্ণির বাইরে থাকতে দেয়নি। তিনি যেসব বিচারককে মনোনীত করেছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে অনেক সময় রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রত্যাশা করেছেন বলে সমালোচনা রয়েছে। অথচ বিচারকের কাজ রাষ্ট্রপতির প্রতি আনুগত্য দেখানো নয়, সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। এই মৌলিক পার্থক্য যখন রাজনৈতিক ভাষণে অস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন আদালতের স্বাধীনতা নিয়েও জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়।
তবে আদালতের ভেতরেও সব সিদ্ধান্ত একরকম নয়। রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রায়ে প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারকরা ভিন্ন জোট তৈরি করেছেন। এতে বোঝা যায়, আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া পুরোপুরি দলীয় রেখায় চলে না। কিন্তু জনধারণা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে শক্তিশালী হয়। মানুষ যখন দেখে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো বারবার একই আদালতে গিয়ে শেষ হচ্ছে, তখন আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক চোখেই বিচার করে।
বর্তমান বাস্তবতা তাই একটি বড় সংকেত দিচ্ছে। যদি আইনসভা নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব ফিরিয়ে না নেয়, তাহলে সর্বোচ্চ আদালতই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের প্রধান মঞ্চ হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কোথায় থামবে, সরকারি সংস্থা কতটা স্বাধীন থাকবে, ভোটের নিয়ম কীভাবে বদলাবে, নাগরিক অধিকার কতদূর সুরক্ষিত থাকবে—এসব প্রশ্ন আদালতের হাতেই বেশি বেশি জমা হবে।
এই পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু ট্রাম্পের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতিদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আজ যে ক্ষমতা একজন রাষ্ট্রপতির হাতে যাচ্ছে, আগামীকাল অন্য দলের রাষ্ট্রপতিও তা ব্যবহার করতে পারেন। তাই বিষয়টি কোনো এক ব্যক্তির জয় বা পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রের কাঠামো, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মূল প্রশ্নটি খুব সরল, কিন্তু উত্তরটি কঠিন। দেশটি কি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি আদালতই রাজনৈতিক অচলাবস্থার শেষ বিচারক হয়ে থাকবে? আইনসভা যদি নিষ্ক্রিয় থাকে এবং রাষ্ট্রপতি যদি ক্ষমতার সীমা বাড়াতে থাকেন, তাহলে সর্বোচ্চ আদালতের প্রভাব আরও বাড়বে। তখন আদালত শুধু আইন ব্যাখ্যা করবে না, বরং আমেরিকার ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, সেটিও অনেকাংশে নির্ধারণ করবে।

