রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছরের বেশি সময় ধরে চললেও সংঘাত থামানোর কোনো বাস্তব অগ্রগতি এখনো দেখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, যুদ্ধ বন্ধে কিয়েভ একাধিকবার প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তার দাবি, শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে মস্কো এখনো সামরিক লক্ষ্য অর্জনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সোমবার, ২৯ জুন, প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চল পুরোপুরি দখলের জন্য রাশিয়া গত চার বছরেরও বেশি সময়ে অন্তত ১৫ বার বিভিন্ন সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু প্রতিবারই সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়ে সময়সীমা পিছিয়ে দিতে হয়েছে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি একদিন আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দেওয়া মন্তব্যেরও জবাব দেন।
রোববার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে পুতিন দাবি করেছিলেন, ইউক্রেন দূরপাল্লার হামলা বন্ধ এবং যুদ্ধের তীব্রতা কমানোর একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে বলেন, এটি মূলত ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ওপর চাপ কমানোর একটি কৌশল।
জেলেনস্কি এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব বাস্তব পরিস্থিতি থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তার মতে, ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি খাত উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়া এখন জ্বালানির ঘাটতির মুখোমুখি। তার ভাষায়, এটি যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব এবং চলমান সংঘাতের বহুমাত্রিক ক্ষতির একটি উদাহরণ মাত্র।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, তার দেশের সামরিক বাহিনী বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। বরং সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুর ওপর নির্ভুল আঘাত হানার নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছে।
ডনবাসকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার কৌশলেরও সমালোচনা করেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, মস্কোর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনো ওই অঞ্চল পুরোপুরি দখলের লক্ষ্যেই অটল রয়েছে। তবে যুদ্ধ যদি একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে রাশিয়াকে আবারও তাদের নির্ধারিত সময়সীমা পরিবর্তন করতে হবে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর রাশিয়া প্রথমে রাজধানী কিয়েভ দখলের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল না হওয়ায় তারা পূর্বাঞ্চলের ডনবাস অঞ্চলে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করে।
বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পুরো লুহানস্ক অঞ্চল এবং দোনেৎস্ক ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের বড় অংশ। যদিও রুশ বাহিনী এখনো দোনেৎস্কের পশ্চিমাঞ্চলের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সেই অগ্রযাত্রার গতি আগের তুলনায় কমে এসেছে। একই সময়ে ইউক্রেন মাঝারি ও দূরপাল্লার ড্রোন হামলার পরিধি আরও বাড়িয়েছে, যা রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
এ মাসের শুরুতে জেলেনস্কি ব্যক্তিগতভাবে পুতিনকে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়ে মুখোমুখি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট যে নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেছেন, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইউক্রেন ইতোমধ্যেই একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাশিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভিডিও বার্তার শেষদিকে জেলেনস্কি রাশিয়ার সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশেও বার্তা দেন। তিনি বলেন, যারা এখনো সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি এবং দৈনন্দিন জীবনে যুদ্ধের প্রভাব অনুভব করছেন, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভাবা উচিত

