ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি এখন আর শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি একটি যুগের নাম। টানা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে তিনি এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে তাঁকে স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধীর মতো নেতাদের সঙ্গে এখন মোদির শাসনকালও তুলনায় আসছে। তবে এই তুলনা শুধু সময়ের দৈর্ঘ্যের কারণে নয়; বরং তাঁর শাসনে ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান—সবকিছুতেই বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
গত এক দশকের বেশি সময়ে ভারত একদিকে অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, কল্যাণমূলক অর্থপ্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানে দ্রুত এগিয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের চোখে একই সময়ে দেশটির গণতান্ত্রিক ভারসাম্য, সংখ্যালঘু অধিকার, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এই কারণেই মোদির ভারতকে এককথায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি শুধু উন্নয়নের গল্প নয়, আবার শুধু গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের গল্পও নয়। বরং এটি শক্তিশালী রাষ্ট্রগঠনের সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক বিভাজন, এবং বৈশ্বিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অস্বস্তির এক জটিল মিশ্রণ।
মোদির অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয় রাষ্ট্রীয় সেবাকে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিল। সরকারি ভর্তুকি বা সহায়তা অনেক সময় মাঝপথে আটকে যেত, দুর্নীতি ও দালালচক্রের কারণে প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে পুরো সুবিধা পৌঁছাত না। মোদি সরকার পূর্ববর্তী উদ্যোগের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাংক হিসাব, পরিচয়ভিত্তিক নিবন্ধন ও মুঠোফোন সংযোগকে একত্র করে এমন ব্যবস্থা চালু করে, যার মাধ্যমে সরকারি অর্থ সরাসরি মানুষের হিসাবে পৌঁছানো সহজ হয়।
এই ব্যবস্থার ফলে কোটি কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। গ্রামাঞ্চলের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সরকারি সহায়তা পেতে তুলনামূলক কম বাধার মুখে পড়ে। নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমে, তাৎক্ষণিক লেনদেনের সুযোগ বাড়ে এবং রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে গতি আসে। তবে এই সাফল্যের মধ্যেও প্রশ্ন আছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় যারা অশিক্ষিত, প্রান্তিক বা নথিপত্রহীন, তারা অনেক সময় বাদ পড়ে যায়। তাই এই পরিবর্তনকে বড় অগ্রগতি বলা যায়, কিন্তু একে পুরোপুরি নিখুঁত বলা যায় না।
অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও মোদি সরকারের অগ্রগতি দৃশ্যমান। সড়ক, বিমানবন্দর, বন্দর, রেলপথ, গ্রামীণ বিদ্যুৎ এবং পানীয় জলের মতো খাতে বড় বিনিয়োগ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে দুর্বল পরিবহনব্যবস্থা, ধীর প্রশাসনিক কাজ এবং অসম উন্নয়ন বাধা হয়ে ছিল। মোদি সরকার এই জায়গাগুলোতে দ্রুততার বার্তা দিয়েছে। বহু গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে, সড়ক যোগাযোগ উন্নত হয়েছে, শহর ও শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ বেড়েছে। এর ফলে বাজার, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সেবাখাতের বিস্তারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে অবকাঠামো উন্নয়ন সবসময় সমানভাবে সুফল দেয় না। বড় প্রকল্পের কারণে কোথাও জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত চাপ, স্থানীয় মানুষের জীবিকায় পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রশ্নও ওঠে। উন্নয়ন যখন দ্রুত হয়, তখন তার সামাজিক মূল্য নিয়েও আলোচনা জরুরি। ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি একই সঙ্গে ধনী প্রযুক্তিনির্ভর শহর এবং গভীর দারিদ্র্যপীড়িত গ্রাম—দুই বাস্তবতাকেই ধারণ করে।
পররাষ্ট্রনীতিতে মোদি ভারতকে আরও আত্মবিশ্বাসী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। ভারত এখন নিজেকে শুধু আঞ্চলিক দেশ হিসেবে নয়, বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। পশ্চিমা বিশ্ব, রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশ, দক্ষিণের দেশগুলো এবং এশীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারত একসঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। কোনো এক পক্ষের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে, স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক রক্ষার এই নীতি ভারতের পুরোনো কূটনৈতিক ধারার নতুন রূপ।
রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে কথা বলার চেষ্টা—সব মিলিয়ে ভারত এখন নিজের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করছে। এতে ভারতের মর্যাদা বেড়েছে, কিন্তু ঝুঁকিও আছে। বিশ্ব রাজনীতি যখন ক্রমেই মেরুকৃত হচ্ছে, তখন সবার সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলা সহজ নয়। কোনো সংঘাতে ভারত কী অবস্থান নেবে, তা নিয়ে দেশে ও বাইরে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
মোদির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্রে পরিবর্তন। তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে হিন্দুত্ববাদ বড় ভূমিকা রাখে। এই আদর্শ ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে চায়। সমর্থকদের মতে, এটি ভারতের সভ্যতাগত আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এর ফলে মুসলিম, খ্রিস্টানসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও প্রান্তিকতার অনুভূতি বেড়েছে।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে বিতর্ক এই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। আইনটির সমালোচকদের দাবি, এতে ধর্মকে নাগরিকত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে আনা হয়েছে এবং মুসলিমদের বাদ রাখার মাধ্যমে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক প্রচার এবং কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা সংখ্যালঘুদের প্রতি সন্দেহ ও বিদ্বেষ বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ভারতের বহুত্ববাদী পরিচয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়েও উদ্বেগ কম নয়। সংবাদমাধ্যম, নির্বাচন-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান, তথ্য অধিকারব্যবস্থা, বিচার বিভাগের কিছু অংশ এবং নাগরিক সমাজের ওপর চাপের অভিযোগ বারবার উঠেছে। বিরোধী নেতা, স্বাধীন সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বেসরকারি সংগঠনের বিরুদ্ধে তদন্ত, আর্থিক নজরদারি বা আইনি পদক্ষেপকে অনেক সমালোচক রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখেন। সরকারের সমর্থকরা অবশ্য বলেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে এবং দুর্নীতি বা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্রে শুধু নির্বাচন থাকলেই যথেষ্ট নয়; স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, প্রশ্ন করার অধিকার এবং ভিন্নমতের নিরাপত্তাও সমান জরুরি।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ভারতের ছবি মিশ্র। দেশটি দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি। প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ, উৎপাদন খাত, সেবা খাত এবং ভোক্তা বাজারের বিস্তার ভারতের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। তরুণ জনসংখ্যা ভারতের বড় শক্তি। কিন্তু এই তরুণদের জন্য যথেষ্ট মানসম্মত, স্থায়ী ও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাগজে শক্তিশালী হলেও, চাকরি ও আয়বৈষম্যের বাস্তবতা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন।
এখানেই মোদি শাসনের বড় দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়। একদিকে তিনি এমন এক রাষ্ট্র গড়েছেন, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে এই দ্রুততা ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা অনেক সময় গণতান্ত্রিক আলোচনার জায়গা সংকুচিত করে। যেসব শক্তি অবকাঠামো ও কল্যাণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে, সেই একই শক্তি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল বা নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।
মোদি সমর্থকদের চোখে তিনি পুরোনো জড়তা ভেঙে দেওয়া নেতা। তাঁদের মতে, তিনি ভারতকে আত্মবিশ্বাসী, কর্মক্ষম ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। উন্নয়ন, কল্যাণ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক মর্যাদায় তাঁর অবদান অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু বিরোধীদের চোখে তিনি এমন এক নেতা, যার আমলে ভারতের উদার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সংখ্যালঘুরা বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছে এবং ভিন্নমতের জায়গা সংকুচিত হয়েছে।
বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি। মোদির ভারত একদিকে উন্নয়নের গতি পেয়েছে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে, কিন্তু সমাজ কি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে? অবকাঠামো বেড়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান কি স্বাধীন থেকেছে? আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ সংহতি কি মজবুত হচ্ছে? এসব প্রশ্নই আগামী দিনের ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
ভারত আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার অর্থনৈতিক শক্তি, জনসংখ্যার সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক প্রভাব বিশ্বকে আকর্ষণ করছে। কিন্তু একই সঙ্গে তার গণতান্ত্রিক চরিত্র, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মোদির শাসনকাল তাই শুধু একজন নেতার সাফল্য বা ব্যর্থতার হিসাব নয়; এটি বোঝার বিষয় যে, একবিংশ শতাব্দীর ভারত কোন পথে হাঁটতে চায়।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মোদির ভারতকে সরলভাবে বিচার করা যায় না। এটি যেমন উন্নয়ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার গল্প, তেমনি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও সামাজিক উদ্বেগের গল্পও। এই দ্বৈত বাস্তবতাই আজকের ভারতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত করে তুলেছে।

