পশ্চিম আফ্রিকার দুই দেশ ঘানা ও আইভরি কোস্টে কয়েক দিনের টানা ভারি বৃষ্টি ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। প্রবল বর্ষণের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও অনেকেই এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার আগে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘানার রাজধানী আক্রা। সোমবার শুরু হওয়া ভারি বৃষ্টির পর মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দেশটির জাতীয় ফায়ার সার্ভিস। সংস্থার মুখপাত্র অ্যালেক্স কিং নার্টে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, এখনও বেশ কয়েকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হবে না।
টানা বর্ষণে আক্রার বহু সড়ক, আবাসিক এলাকা ও নিচু অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার রাতারাতি ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা রাতভর অভিযান চালিয়ে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করেন। গ্রেটার আক্রা অঞ্চলের ফায়ার সার্ভিসের কমান্ডার রশিদ কওয়ামে নিসাউ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জরুরি সহায়তা দেওয়ার কাজও চলছে।
ঘানার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, সোমবার সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘরে পানি ঢুকে পড়া এবং মানুষ আটকে থাকার অসংখ্য খবর আসতে শুরু করে। সংস্থাটির উপপরিচালক মারিয়াম ডংয়েলা মিল্লাহ বলেন, অনেক এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে পুরো বসতি পানির নিচে চলে গেছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে, আইভরি কোস্টেও শনিবার থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণ ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দেশটির সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ না করলেও দমকল বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, সেখানে প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধারকাজ এখনও চলমান থাকায় সেখানেও হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্যোগের পর ঘানার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ মুনতাকা মোবারক স্বীকার করেছেন, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি আরও কার্যকর হতে পারত। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট জন মাহামা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী শুধু আক্রাতেই প্রায় ১৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি গত বছরের সর্বোচ্চ একদিনের বৃষ্টিপাতের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে, যা নগর ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতির এই পরিবর্তন পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও মানুষের তৈরি ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিশেষ করে জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা অবৈধ স্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্যার ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
ঘানার আবহাওয়া অধিদপ্তরও সতর্ক করেছে যে চলতি সপ্তাহজুড়ে আরও ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই রাজধানীসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া, নিচু এলাকা এড়িয়ে চলা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক জলপথ দখল—এসব কারণ দুর্যোগকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। ফলে শুধু জরুরি উদ্ধার অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নগর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করাই ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

