গরু জবাইকে কেন্দ্র করে ভারতে আবারও শুরু হয়েছে নতুন আইনি বিতর্ক। চলতি বছরের মে মাসে তামিলনাড়ুতে গরু ও বাছুর জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন মাদ্রাজ উচ্চ আদালত। তবে সেই সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে এবার সর্বোচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন তামিলনাড়ু সরকার।
বুধবার (১ জুলাই) ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকার সর্বোচ্চ আদালতে বিশেষ আবেদন দাখিল করে দাবি করেছে, উচ্চ আদালতের রায় তামিলনাড়ুতে প্রচলিত আইন এবং আইনসভার নির্ধারিত ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকারের মতে, বিদ্যমান আইনের ব্যাখ্যা না মেনে অতিরিক্ত নির্দেশনা দেওয়ার মাধ্যমে উচ্চ আদালত তার এখতিয়ারের সীমা অতিক্রম করেছে।
গত ২৭ মে দেওয়া রায়ে মাদ্রাজ উচ্চ আদালত রাজ্যজুড়ে গরু ও বাছুর জবাইয়ের ওপর কার্যত পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আদালত একই সঙ্গে নির্দেশ দেয়, শুধু অনুমোদিত কসাইখানায় পশু জবাই করা যাবে এবং ঈদুল আজহাসহ যেকোনো সময়ে গরু ও বাছুর জবাই ঠেকাতে রাজ্যের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এই নির্দেশ বাস্তবায়নে মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদেরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়।
তবে রাজ্য সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮ অনুযায়ী সব ধরনের গরু জবাই নিষিদ্ধ নয়। ওই আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১০ বছরের বেশি বয়সী এবং কর্মক্ষমতা বা প্রজনন সক্ষমতা হারানো গরু বা বাছুর নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে জবাই করা যেতে পারে। ফলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রাজ্য সরকারের আরও অভিযোগ, বিচার বিভাগের দায়িত্ব আইন ব্যাখ্যা করা, নতুন আইন তৈরি করা নয়। তাদের মতে, উচ্চ আদালতের নির্দেশের ফলে আইনসভা প্রণীত বিধানের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ছে, যা ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নও সামনে আনছে।
এই বিতর্কের সূচনা হয় একটি জনস্বার্থমূলক আবেদনের মাধ্যমে। তামিলনাড়ুর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ইন্দু মাক্কাল কাচ্চির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সূর্য প্রকাশ্যে অবৈধভাবে গরু জবাই বন্ধে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেন। সেই আবেদনের শুনানি শেষে উচ্চ আদালত আলোচিত নির্দেশনা জারি করে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিষয়টি কেবল গরু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিচার বিভাগ ও আইনসভার ক্ষমতার সীমারেখা, রাজ্যের নিজস্ব আইন প্রয়োগের অধিকার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন নজর সর্বোচ্চ আদালতের দিকে। আদালত যদি রাজ্য সরকারের আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে শুধু তামিলনাড়ুই নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও গরু জবাই-সংক্রান্ত আইন ও বিচারিক নির্দেশনার ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যায় এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, কৃষি অর্থনীতি, পশু সংরক্ষণ এবং সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য—সব মিলিয়ে বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

