বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ন্যাটোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কত টাকা খরচ করা হবে, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, সেই টাকা কত দ্রুত বাস্তব সামরিক সক্ষমতায় রূপ নেওয়া যাবে। যুদ্ধের প্রস্তুতি কাগজে-কলমে বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে তৈরি হয় না। এর জন্য দরকার কারখানা, দক্ষ শ্রমশক্তি, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং এমন বাজার কাঠামো, যা সংকটের সময় দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে।
সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা আলোচনায় ন্যাটো সদস্য দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর অঙ্গীকার করছে। নতুন অস্ত্র কেনা, সেনাবাহিনী আধুনিক করা, গোলাবারুদ মজুত বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু শুধু ব্যয় বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। কারণ সামরিক শক্তি তৈরি হয় উৎপাদনের মাধ্যমে, আর উৎপাদন তৈরি হয় স্থায়ী বাজার, বিনিয়োগ এবং শিল্প সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে।
ইতিহাস এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় কানাডার সামরিক শিল্প খুব শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে দেশটি বিপুল পরিমাণ যুদ্ধবিমান, নৌযান এবং সামরিক যান তৈরি করতে সক্ষম হয়। এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু সরকারি অর্থ ছিল না; ছিল পরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান, অর্থায়নের ব্যবস্থা, কারখানা সম্প্রসারণ এবং দ্রুত উৎপাদনের উপযোগী শিল্প কাঠামো। অর্থাৎ কানাডা শুধু টাকা খরচ করেনি, সেই টাকাকে উৎপাদনে রূপ দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।
আজ ন্যাটোর জন্য সেই শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর কাছে টাকা আছে, প্রযুক্তি আছে, দক্ষতা আছে এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাও আছে। কিন্তু সমস্যাটি অন্য জায়গায়। অনেক দেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা সীমিত। অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহে দীর্ঘ সময় লাগে। গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল। ফলে প্রতিরক্ষা খরচ বাড়লেও বাস্তব সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে না।
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, আধুনিক সংঘাতে অর্থায়ন যুদ্ধক্ষেত্রের আগেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ড্রোন উৎপাদন, সফটওয়্যার, প্রকৌশলী, কারখানা, যন্ত্রাংশ এবং সরবরাহব্যবস্থা—সবকিছুর জন্য আগে বিনিয়োগ দরকার। তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন অনেক সময় বহু গুণ দামি সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করতে পারে। আবার প্রতিপক্ষ সেই ড্রোন ঠেকাতে অনেক বেশি দামি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। ফলে আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়, এটি উৎপাদন ও অর্থায়নেরও লড়াই।
ন্যাটোর মূল দুর্বলতা এখানেই। সদস্য দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে বেশি টাকা দিতে রাজি হলেও, সেই টাকাকে দ্রুত কারখানা, গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে রূপান্তর করার বাজারব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। কারখানা তৈরি করতে সময় লাগে। উৎপাদন লাইন বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দরকার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তখনই বিনিয়োগ করবে, যখন তারা বুঝবে ভবিষ্যতে স্থায়ী চাহিদা থাকবে এবং অর্থায়নের খরচ সহনীয় থাকবে।
এখানে প্রথম বড় প্রয়োজন হলো বিশ্বাসযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা তৈরি করা। সরকার যদি শুধু এক বছরের জন্য অস্ত্র কেনার ঘোষণা দেয়, তাহলে কোনো প্রতিষ্ঠান বড় কারখানা বানাতে ঝুঁকি নেবে না। কিন্তু যদি কয়েক বছর ধরে নিশ্চিত ক্রয়চুক্তি থাকে, তাহলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বাড়াতে সাহস পাবে। একক দেশ নয়, মিত্র দেশগুলো যৌথভাবে এমন ক্রয় প্রতিশ্রুতি দিলে বাজার আরও শক্তিশালী হবে।
দ্বিতীয় প্রয়োজন হলো সহজ ও সাশ্রয়ী অর্থায়ন। নতুন কারখানা, উৎপাদন লাইন, যন্ত্রপাতি এবং সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করতে বড় অঙ্কের আগাম বিনিয়োগ দরকার। সাধারণত প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। কিন্তু ঋণের সুদ বেশি হলে শেষ পর্যন্ত সেই খরচ অস্ত্রের দামে যুক্ত হয়। তখন সরকার একই বাজেটে কম অস্ত্র কিনতে পারে। অর্থাৎ অর্থায়নের খরচ বেশি হলে প্রতিরক্ষা বাজেটের কার্যকারিতা কমে যায়।
এই কারণে ন্যাটোর জন্য একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা অর্থায়ন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে। এমন একটি বহুপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে, যা প্রতিরক্ষা শিল্প, নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও বিনিয়োগ সহায়তা দেবে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বেশি আস্থা পাবে। সরকারি নিশ্চয়তা থাকলে ঋণের ঝুঁকি কমবে, সুদ কমবে এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে।
এই ধারণার মূল শক্তি হলো—সরকার একা সবকিছু করবে না, আবার বাজারকেও একা ছেড়ে দেবে না। বরং সরকার দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার নিশ্চয়তা দেবে, আর বিশেষ অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের পুঁজি জোগাতে সাহায্য করবে। এতে প্রতিরক্ষা বাজেট শুধু খরচ থাকবে না; তা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে পরিণত হবে।
ন্যাটোর জন্য এটি শুধু সামরিক নীতির প্রশ্ন নয়, এটি শিল্পনীতিরও প্রশ্ন। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যে বিনিয়োগ দরকার, তা একই সঙ্গে উৎপাদন খাত, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, রপ্তানি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করতে পারে। কারখানা বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। গবেষণা বাড়লে নতুন প্রযুক্তি তৈরি হবে। সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হলে বেসামরিক শিল্পও উপকৃত হতে পারে।
তবে এখানে সতর্কতার জায়গাও আছে। প্রতিরক্ষা বাজার গড়ার নামে যদি শুধু বড় বড় অস্ত্র কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে জনগণের করের টাকা অকার্যকরভাবে খরচ হতে পারে। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, মূল্যনিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে ক্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানো জরুরি, কিন্তু তা যেন অযৌক্তিক মুনাফা বা রাজনৈতিক প্রভাবের বাজারে পরিণত না হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়। প্রত্যেক দেশ আলাদা আলাদা অস্ত্র কিনলে, আলাদা মানদণ্ড তৈরি করলে এবং আলাদা সরবরাহব্যবস্থা চালালে ব্যয় বাড়বে, উৎপাদন ধীর হবে এবং যুদ্ধের সময় সমন্বয় কঠিন হবে। তাই যৌথ চাহিদা, অভিন্ন মান, ভাগাভাগি উৎপাদন এবং পারস্পরিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
বর্তমান নিরাপত্তা পরিবেশে প্রতিরোধ ক্ষমতা শুধু সেনা মোতায়েনের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিপক্ষকে বোঝাতে হবে যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলেও ন্যাটো দ্রুত গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন করে যেতে পারবে। অর্থাৎ প্রতিরোধের শক্তি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, কারখানাতেও তৈরি হয়।
এই বাস্তবতায় ন্যাটোর সামনে তিনটি বড় কাজ স্পষ্ট। প্রথমত, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরাপদ ও লাভজনক করার মতো বাজার কাঠামো তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, মিত্র দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়, অর্থায়ন ও উৎপাদন পরিকল্পনায় সমন্বয় আনতে হবে।
যদি ন্যাটো শুধু বাজেট বাড়ায় কিন্তু উৎপাদন ক্ষমতা না বাড়ায়, তাহলে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি কাগজে শক্তিশালী দেখালেও বাস্তবে দুর্বল থাকবে। আবার যদি অর্থায়ন, চাহিদা ও শিল্প কাঠামো একসঙ্গে গড়ে তোলা যায়, তাহলে প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রকৃত সক্ষমতায় রূপ নেবে।
শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা শুধু অস্ত্র কেনার বিষয় নয়; নিরাপত্তা হলো সেই ব্যবস্থা তৈরি করা, যা সংকটের সময় দ্রুত অস্ত্র, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে। আধুনিক যুদ্ধের যুগে যে দেশ বা জোট উৎপাদন করতে পারে, অর্থায়ন করতে পারে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। ন্যাটোর জন্য তাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—বেশি টাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা বাজার তৈরি করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাজার তৈরি হলে প্রতিরক্ষা ব্যয় শুধু ব্যয় থাকবে না। তা হবে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ থেকে আসবে উৎপাদন। আর উৎপাদনই শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ ক্ষমতার সবচেয়ে বাস্তব ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে

