ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে যে সন্দেহ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হচ্ছিল, সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধান সেই সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য চীনে গোপন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালানো হয়েছিল। বিষয়টি শুধু সাধারণ সামরিক বিনিময় নয়; বরং তেজস্ক্রিয়, রাসায়নিক ও জীবাণু-সুরক্ষা-সংক্রান্ত সংবেদনশীল প্রশিক্ষণও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলৌসভ ২০২৫ সালের আগস্টে একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনার মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ অনুমোদন করেন। সেই অনুমোদনের ভিত্তিতে রুশ সামরিক প্রতিনিধিরা চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির বিভিন্ন স্থাপনায় প্রশিক্ষণে অংশ নেন। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এতে দুই দেশের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে এসেছে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—চীন কি সত্যিই ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে আছে, নাকি পর্দার আড়ালে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে? বেইজিং বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা যুদ্ধের পক্ষ নয়; বরং শান্তি আলোচনার পক্ষে। কিন্তু রুশ বাহিনীকে সংবেদনশীল সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ সেই অবস্থানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রশিক্ষণের ধরনই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ সেনারা চীনা প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকরণ, রাসায়নিক গোয়েন্দা কার্যক্রম, দূষিত পরিবেশে সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বায়ু চলাচল ব্যবস্থা রক্ষার কৌশল শেখে। এমন প্রশিক্ষণ সাধারণ সামরিক সৌজন্য বিনিময়ের পর্যায়ে পড়ে না; বরং এটি যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি তাই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে হয়েছে।
চীন অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেন সংকট নিয়ে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত এবং প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগ ভিত্তিহীন। অন্যদিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও প্রতিবেদনের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। রুশ রাজনৈতিক মহল থেকে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর চীনের কাছ থেকে শেখার মতো কিছু নেই। তবে অস্বীকারের ভাষা যতই শক্ত হোক, ইউরোপীয় মহলে সন্দেহ কাটছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগের কারণ শুধু এই প্রশিক্ষণ নয়। এর আগে রয়টার্স জানায়, ২০২৫ সালের শেষদিকে প্রায় দুই শত রুশ সেনা চীনে প্রশিক্ষণ নেয় এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরে ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাসও জুন মাসে বলেন, ব্রাসেলস নিজস্ব সূত্রে এ ধরনের প্রশিক্ষণের তথ্য পেয়েছে এবং এর প্রভাব মূল্যায়ন করছে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রতি ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ চীনকে প্রধানত বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে দেখেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীন ইউরোপীয় বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা ইউরোপকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—চীনকে কি শুধু অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা যথেষ্ট, নাকি তাকে রাশিয়ার যুদ্ধ-সহায়ক কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে?
এই বিতর্ক ইউরোপের জন্য সহজ নয়। একদিকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নষ্ট করা ইউরোপীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় চীনা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ভূমিকা উপেক্ষা করলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে রাশিয়াকে সহায়তার অভিযোগে কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নতুন অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেই চাপ আরও বাড়তে পারে।
চীন ও রাশিয়ার সামরিক সম্পর্কের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বিপরীতে চীনের সেনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্র, প্রযুক্তি ও বিশাল কাঠামোর অধিকারী হলেও বহু দশক ধরে বড় কোনো সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। ফলে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার হাতে আছে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা; আর চীনের হাতে আছে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো ও সংগঠিত সামরিক সক্ষমতা।
রয়টার্সের দেখা রুশ সামরিক নথিতে চীনা প্রশিক্ষণের কিছু ইতিবাচক দিকও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ব্যবহৃত সরঞ্জামের মান, প্রশিক্ষকদের তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং অনুশীলনব্যবস্থার প্রশংসা করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে চীনা বাহিনীর বাস্তব যুদ্ধ-অভিজ্ঞতার ঘাটতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এই মন্তব্য দেখায়, রাশিয়া চীনের সামরিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিলেও অভিজ্ঞতার জায়গায় নিজেকে এখনও এগিয়ে রাখছে।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কয়েকটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। প্রথমত, ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থানকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চীন প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও তার সামরিক সম্পর্কগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। তৃতীয়ত, ইউরোপের সামনে এখন কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন—চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ধরে রেখে কীভাবে নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা করা যায়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, চীন–রাশিয়া সম্পর্ক এখন আর শুধু কূটনৈতিক বন্ধুত্বের বিষয় নয়। এটি সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক হিসাবের জটিল মিশ্রণে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, মস্কো তত বেশি বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। আর বেইজিংও পশ্চিমা চাপের মুখে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত বোঝাপড়া বজায় রেখে নিজের বৈশ্বিক অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
তাই এই গোপন প্রশিক্ষণ বিতর্ককে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বরাজনীতির এক বড় ইঙ্গিত—যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র এক দেশে হলেও তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহু রাজধানীতে। ইউরোপ, চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের সম্পর্ক আগামী দিনে কোন দিকে যাবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও হতে পারে এই ঘটনা।

