মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের দ্রুত অবসানের সম্ভাবনা নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি মন্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি বলেছেন, এই অঞ্চলে ইসরাইলের যুদ্ধের কোনো শেষ নেই। তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার নীতিতেই অটল রয়েছে ইসরাইল।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু এই মন্তব্য করেন। ইসরাইলে সরকারপন্থী অবস্থানের জন্য পরিচিত ওই সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সামরিক অভিযান এবং ইসরাইলের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, এই অঞ্চলে ইসরাইলের যুদ্ধ কি শেষ হওয়ার পথে? জবাবে তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজন হলে সামরিক অভিযান ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।
নেতানিয়াহু দাবি করেন, হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সামরিক তৎপরতার মাধ্যমে ইসরাইল উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তাঁর ভাষায়, এসব অভিযানের মাধ্যমে দেশটির নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
সাম্প্রতিক ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে কেউ ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস করেনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাস্তবতা বদলে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইল যে ‘নিশ্চিত বিজয়ের’ লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল, সেটি এখনও অর্জন করা সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু বলেন, এই সংগ্রামের কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তি নেই। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থিতিশীল অঞ্চলে টিকে থাকতে হলে সামরিক শক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি আরও দাবি করেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ইসরাইল এখন অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে নিজের সরকারের সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইসরাইল যে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে, তা অনেকেই বিশ্বাস করেননি। বক্তব্য শেষ করে উপস্থিত দর্শকদের দিকে তাকিয়ে তিনি হাততালির আহ্বান জানান। এরপর উপস্থিত দর্শকেরা করতালি দেন।
গাজার বাসিন্দাদের অন্যত্র স্থানান্তরের প্রসঙ্গেও প্রশ্ন করা হলে নেতানিয়াহু বলেন, এটি জোরপূর্বক নয়, বরং স্বেচ্ছায় স্থানান্তরের বিষয়। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা সম্পর্কেও সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, তিনি কথার চেয়ে কাজেই বেশি বিশ্বাসী।
আন্তর্জাতিক চাপের বিষয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিভিন্ন দেশ থেকে রাজনৈতিক চাপ থাকলেও প্রতিটি বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন না।
এদিকে ইসরাইলের একটি প্রভাবশালী দৈনিকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে বর্ণবাদী মনোভাব আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে পরিচালিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী মনে করে, ইসরাইলের কিছু জনগোষ্ঠীর সমাজে সমান অধিকার থাকা উচিত নয়।
জরিপ অনুযায়ী, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫২ শতাংশ এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এই মতের সঙ্গে একমত। আরবি ভাষার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই হার ৩৪ শতাংশ।
শিক্ষাবিদ ও যুবকর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয়তাবাদী মনোভাবের পাশাপাশি সামাজিক বিভাজনও বেড়েছে। একই সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমাধান বা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি আস্থাও কমে গেছে।
অন্যদিকে, ইসরাইলের একটি গবেষণায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে শিশু ও পরিবারগুলোর ওপর গভীর মানসিক প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে। প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সাত বছরের কম বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশু যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাতের লক্ষণে ভুগছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ সেনাদের ৭৫ শতাংশ শিশুর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের মানসিক আঘাতের লক্ষণ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ শিশু গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।
শুধু শিশুরাই নয়, জরিপে অংশ নেওয়া বাবাদের ৩৫ শতাংশ এবং মায়েদের ৪২ শতাংশও বিভিন্ন মাত্রার মানসিক চাপ ও আঘাতের কথা জানিয়েছেন। গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ফলে ইসরাইলের বহু পরিবার গভীর মানসিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।

