ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সময় যত গড়ায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসে। কিন্তু কখনো কখনো বাস্তবতা সেই ধারণাকেই ভুল প্রমাণ করে। ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী দুই দফা ভূমিকম্পের আট দিন পর ধসে পড়া একটি ভবনের নিচ থেকে ৪৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরে উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে যেমন আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে, তেমনি স্বজন হারানো হাজারো মানুষের মাঝেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির নাম হার্নান আলবার্তো গিল। তিনি পেশায় একজন নিরাপত্তাকর্মী। ভূমিকম্পের সময় উপকূলীয় ক্যাটিয়া লা মার এলাকায় একটি ভবনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভবনটি মুহূর্তেই ধসে পড়লে তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে যান।
গত বৃহস্পতিবার দীর্ঘ ও জটিল উদ্ধার অভিযানের পর অবশেষে ধ্বংসস্তূপ ভেদ করে হার্নান গিলকে জীবিত বের করে আনতে সক্ষম হন উদ্ধারকর্মীরা। তাকে স্ট্রেচারে করে বাইরে আনার মুহূর্তে উপস্থিত শত শত উদ্ধারকর্মী আবেগে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। এতদিনের কঠোর পরিশ্রম সফল হওয়ায় পুরো এলাকায় স্বস্তি ও আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
গিলের স্ত্রী গুসবিমার গঞ্জালেস এই ঘটনাকে ‘অলৌকিক’ বলে উল্লেখ করেন। স্বামীর জীবিত ফিরে আসার খবর পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, এমন ঘটনার জন্য তারা কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না।
হার্নান গিলকে জীবিত উদ্ধারের জন্য শুধু ভেনেজুয়েলার উদ্ধারকারী দল নয়, আরও সাতটি দেশের বিশেষজ্ঞরাও যৌথভাবে কাজ করেন। টানা ৭২ ঘণ্টা ধরে তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে উদ্ধার অভিযান চালান।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অবস্থায় গিলকে বাঁচিয়ে রাখতে একটি পাইপের মাধ্যমে ১০ লিটারেরও বেশি পানি সরবরাহ করা হয়। একই সঙ্গে একটি বিশেষ নলের সাহায্যে তাকে অক্সিজেনও দেওয়া হয়, যাতে তিনি শ্বাস নিতে পারেন।
অভিযানের শেষ পর্যায়ে প্রায় ৩০ জন উদ্ধারকর্মী ভবনের পার্কিং এলাকার ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে অংশ নেন। পাশাপাশি দুইজন বিশেষজ্ঞ প্রায় তিন মিটার দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করে আটকে থাকা ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
চিলির উদ্ধারকারী দলের নেতা ক্রিশ্চিয়ান ভেরা জানান, যেখানে হার্নান গিল আটকে ছিলেন সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন ছিল। সামান্য ভুলও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। তাই প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুন আঘাত হানা শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দুই হাজার ৬০০ জনে পৌঁছেছে। সর্বশেষ হিসাবে নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ৫৯৫ জন, আর আহতের সংখ্যা ১২ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘের ধারণা, এখনও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান অভিযান অব্যাহত থাকলেও জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন কমে আসছে।
তবে কয়েক দিন আগে ভূমিকম্পের ছয় দিন পর তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনাও উদ্ধারকারীদের মনোবল বাড়িয়েছে।
শুধু প্রাণহানিই নয়, ভূমিকম্পের ফলে ভেনেজুয়েলার বহু এলাকায় ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সরকারি হিসাবে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকে রাস্তায়, পার্কে কিংবা অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে পড়ছে এবং চিকিৎসাসেবা মারাত্মক চাপে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে বিশুদ্ধ পানির সংকট ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে প্রায় ৬০ হাজার ভবন আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাজধানী কারাকাসের উত্তরের শহর লা গুয়াইরা-তে ধসে পড়া অধিকাংশ ভবনের গায়ে ‘ডি’ চিহ্ন লিখে দেওয়া হয়েছে। এই চিহ্নের অর্থ হলো, ভবনটিতে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে এবং সেখানে আর কোনো জীবিত মানুষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পের পর ত্রাণ কার্যক্রমে ধীরগতির অভিযোগ তুলেছেন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। তাদের অভিযোগ, দুর্গত এলাকায় সময়মতো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি।
তবে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে দাবি করেছেন, দুর্যোগের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চার হাজার উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়। এরপর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ১১ হাজার সরকারি কর্মকর্তা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত হন।
তিনি আরও জানান, নিহতদের জন্য কোনো গণকবর তৈরির পরিকল্পনা সরকারের নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। এরপর সময় যত বাড়ে, জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা তত কমতে থাকে। সেই বিবেচনায় আট দিন পর হার্নান গিলের জীবিত উদ্ধার হওয়া সত্যিই বিরল ঘটনা।
এই উদ্ধার অভিযান শুধু একটি প্রাণ রক্ষার ঘটনা নয়; এটি প্রমাণ করেছে যে দুর্যোগের পর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব কতটা। একই সঙ্গে এটি হাজারো স্বজনহারানো পরিবারের কাছে একটি বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে—আশা কখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না, যদি অনুসন্ধানের চেষ্টা থেমে না যায়।

